Maoist Operations

মাওবাদী জঙ্গি মিসিরকে জেরা করবে এনআইএ-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় সংস্থা, রাজ‍্যগুলিও পাঠাবে প্রতিনিধি, খবর সূত্রের

গত শুক্রবার ঝাড়খন্ডের রাঁচীতে যান সিআরপিএফের ডিজি জ্ঞানেন্দ্রপ্রতাপ সিংহ। তিনি সেখানে গিয়ে কোবরা বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি জানান, মিসির বেসরার গ্রেফতারি একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। এর জন‍্য কেবরা বাহিনী এবং ঝাড়খন্ড পুলিশকে ধন্যবাদ দিয়েছে।

মাওবাদী জঙ্গি মিসির বেসরা।
নিজস্ব সংবাদদাতা, ঝাড়খণ্ড
  • শেষ আপডেট: ০১ আগস্ট ২০২৬ ১২:৫১

মাওবাদী জঙ্গি মিসির বেসরাকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। বুধবার রাত ১০টা নাগাদ গিরিডি থেকে মিসিরকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সেই সঙ্গে মেহনত ওরফে মোচ্ছু এবং গৌরবকেও গ্রেফতার করা হয়েছে। মিসির বেসরার বিরুদ্ধে ১৪১টি মামলা রয়েছে। সূত্রের খবর, তাকে জেরা করতে ঝাড়খন্ড যেতে পারে এনআইএ, সিবিআই, এনসিবি-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় সংস্থা। এ ছাড়াও, কিছু রাজ্যের পুলিশও ঝাড়খন্ডে যেতে পারে বলে জানা গিয়েছে।

মেহনত ওরফে মোচ্ছু সংগঠনের আঞ্চলিক কমিটির সদস্য ছিল। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য রাজ্য সরকার ১৫ লক্ষ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। গত বুধবার রাতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সিআরপিএফের কোবরা এবং ঝাড়খণ্ড পুলিশের একটি যৌথ দল এই অভিযান চালায়। ধানবাদ-গিরিডি সীমান্তে গ্রেফতার হয়।

দীর্ঘদিন ধরে পলাতক মিসির বেসরার মাথার দাম ছিল এক কোটি টাকা। মিসির নিরাপত্তা সংস্থাগুলির কাছে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ বা সর্বাধিক কাঙ্ক্ষিত অপরাধীদের তালিকায় ছিল। তাকে গ্রেফতার করে ঝাড়খণ্ডে মাওবাদীবিরোধী অভিযানের অন্যতম বড় সাফল্য পেয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। বর্তমানে ঝাড়খণ্ডে মাত্র ১৭ জন মাওবাদী জঙ্গি অবশিষ্ট রয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মাওবাদী সংগঠনের শীর্ষ নেতা ও পলিটব্যুরো সদস্য মিসির বেসরা ‘ভাস্কর’, ‘সুনির্মল’ এবং ‘সাগর’ নামেও পরিচিত ছিল।

গত ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরের রাঁচির কাছে কুঠি এলাকায় থেকে মাওবাদী জঙ্গিনেতা মিশির বেসরা গ্রেফতার করা হয়। ওই দিন মিসিরের গাড়ি থেকে বিপুল পরিমাণ ডেটোনেটর উদ্ধার হয়। ঝাড়খণ্ডে সংঘটিত একাধিক ভয়াবহ হামলার মূলচক্রী এই জঙ্গি মিশির বেসরা। কিন্তু ২০০৯ সালে বিহারের লখিসরাই আদালত চত্বরে মাওবাদী জঙ্গিরা হামলা চালায়। সেই সময় বিহার পুলিশের হেফাজত থেকে পালিয়ে যায় মিসির বেসরা। সেদিন মিশিরকে আদালতে হাজিরার জন‍্য আনা হচ্ছিল। প্রায় দুই দশক পরেও ৬৬ বছরের মাওবাদী জঙ্গিনেতা মিসির বেসরা নিরাপত্তাবাহিনীর কাছে অধরা থাকার পরে অবশেষে বুধবার রাতে গ্রেফতার হয়।

মিসির বেসরার বিরুদ্ধে ঝাড়খন্ড, বিহার-সহ বিভিন্ন রাজ‍্যে ১৪১টি মামলা রয়েছে। অস্ত্র, মাদক, সন্ত্রাসযোগ, দেশবিরোধী কার্যকলাপের মামলা রয়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে নিজের বাড়িতেই ফেরেনি মিসির। গ্রেফতার হওয়ার পরে তার দাদা এমনটাই জানিয়েছিলেন। সেই সময় থেকে কী ভাবে কাজ করত, তা জানতেই জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা, এনআইএয়ের গোয়েন্দারা ঝাড়খন্ডে আসতে পারেন। মিসির বর্তমানে ১৪ দিনের পুলিশ হেফাজতে রয়েছে। জানা গিয়েছে, এনআইএ ছাড়াও ডিআরআই, এনসিবি, ইডি-সহ একাধিক কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা মিসিরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

এই মাওবাদী জঙ্গিদের চারণভূমি মূলত ঝাড়খন্ড, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র, পশ্চিমবঙ্গ, ছত্তীসগঢ় এবং বিহারের বিভিন্ন জায়গায় ছিল। এই সময় রাজ‍্যেও একাধিক মামলা রয়েছে মিসিরের বিরুদ্ধে। অন‍্য দিকে, বাকি মামলাগুলিতে মিসির বেসরার যোগ রয়েছে। তা নিয়েও এই সমস্ত রাজ‍্যের পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করতে ঝাড়খন্ডে যে পারে বলে জানা গিয়েছে।

মিসিরের সঙ্গে মোচ্ছু এবং গৌরব গ্রেফতার হয়েছে। মেহনত ওরফে বিভীষণ ওরফে কুম্বা মুর্মু নামেও মোচ্ছু পরিচিত ছিল। গৌরবের ছদ্মনাম ছিল সৌরভ। মোচ্ছু মাওবাদী জঙ্গি সংগঠনের আঞ্চলিক কমিটির সদস্য ছিল। মোচ্ছু আর গৌরবের বিরুদ্ধে একাধিক রাজ্যে একাধিক মামলা রয়েছে। তাদেরও গোয়েন্দারা জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় বলে জানা গিয়েছে।

গত শুক্রবার ঝাড়খন্ডের রাঁচীতে যান সিআরপিএফের ডিজি জ্ঞানেন্দ্রপ্রতাপ সিংহ। তিনি সেখানে গিয়ে কোবরা বাহিনীর জওয়ানদের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। তিনি জানান, মিসির বেসরার গ্রেফতারি একটা ঐতিহাসিক ঘটনা। এর জন‍্য কেবরা বাহিনী এবং ঝাড়খন্ড পুলিশকে ধন্যবাদ দিয়েছে।

অন‍্য দিকে, চলতি রাজ‍্যসভার অধিবেশনে লিখিত জবাবে দেশে মাওবাদমুক্ত হওয়ার পরিসংখ্যান তুলে ধরেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিত‍্যানন্দ রাই। তিনি জানিয়েছেন, দেশে আর কোনও জেলাতেই মাওবাদী জঙ্গিদের উপদ্রব নেই। ২০১৮ সালের এপ্রিলে মাওবাদী উপদ্রুত জেলা ১২৬ থেকে ৯০-এ নেমে আসে। তার পরে ২০২১ সালের জুলাইয়ে তা ৭০-এ নামে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে এই ধরনের জেলার সংখ্যা ৩৮ হয়ে যায়। পরে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ওই সংখ্যা আটে নেমে আসে। চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলে মাওবাদী উপদ্রুত জেলা ‘শূন্য’ হয়ে গিয়েছে।

এই প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমানে ৩৭টি জেলাকে ‘লিগাসি অ্যান্ড থ্রাস্ট’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারের বক্তব্য, এই জেলাগুলির কোনওটিতেই বর্তমানে আর মাওবাদী জঙ্গিদের উপদ্রব নেই। তবে যে স্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তা বজায় রাখতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং উন্নয়নমূলক কার্যকলাপ চালিয়ে যেতে হবে।

এর পরেই কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী নিত‍্যানন্দ জানান, একটি জেলাকে ‘উদ্বেগজনক’ হিসেবে চিহ্নিত করে রাখা হয়েছে। সেখানে মাওবাদীদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। তাদের সাংগঠনিক কাঠামোও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তবে পরিস্থিতি যাতে ফের আগের মতো না হয়ে যায়, তা নিশ্চিত করতে নজরদারি চালিয়ে যাওয়া দরকার বলে মনে করছে কেন্দ্র।


Share