Supreme Court

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ে প্রধান বিচারপতিকে কেন বাদ? কেন্দ্রকে প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের, ‘নিরপেক্ষতা শুধু থাকলেই নয়, চোখেও পড়তে হবে’

কেন্দ্রের কাছে শীর্ষ আদালতের প্রশ্ন, সিবিআই অধিকর্তা বা লোকপাল নিয়োগের বাছাই কমিটিতে যদি প্রধান বিচারপতি সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন, তবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁকে কেন সেই কমিটি থেকে বাদ রাখা হয়েছে?

সুপ্রিম কোর্ট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ ০৫:০০

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার এবং অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের জন্য গঠিত তিন সদস্যের নির্বাচন কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলল সুপ্রিম কোর্ট। কেন্দ্রের কাছে শীর্ষ আদালতের প্রশ্ন, সিবিআই অধিকর্তা বা লোকপাল নিয়োগের বাছাই কমিটিতে যদি প্রধান বিচারপতি সদস্য হিসেবে থাকতে পারেন, তবে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগের ক্ষেত্রে তাঁকে কেন সেই কমিটি থেকে বাদ রাখা হয়েছে?

মুখ্য নির্বাচন কমিশনার বাছাইয়ের প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ নয় এই অভিযোগে দায়ের হওয়া মামলার শুনানি চলছে সুপ্রিম কোর্টে। বিচারপতি দীপঙ্কর দত্ত ও বিচারপতি সতীশচন্দ্র শর্মার ডিভিশন বেঞ্চে বৃহস্পতিবার মামলার শুনানির সময় গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে আদালত। বিচারপতিরা বলেন, নির্বাচন কমিশনের শুধু নিরপেক্ষভাবে কাজ করলেই হবে না, সেই নিরপেক্ষতা সাধারণ মানুষের কাছেও স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হওয়া জরুরি। আদালতের ভাষায়, ‘বিচার কেবল পাইয়ে দিলেই হয় না, তা দেখানোও জরুরি। ঠিক তেমনই নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতাও যেন সব দিক থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়।’

জবাবে কেন্দ্রের পক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল আর. ভেঙ্কটরমানি আদালতে সওয়াল করেন, সংসদে পাস হওয়া একটি আইনকে এভাবে প্রশ্নের মুখে ফেলা উচিত নয়। কেন্দ্রের পক্ষে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও জানান, গণতন্ত্রের তিনটি স্তম্ভ- প্রশাসন, আইনসভা এবং বিচারবিভাগ প্রত্যেকেই স্বাধীন। তাই এক অঙ্গের কাজে অন্য অঙ্গের অযথা হস্তক্ষেপ এড়ানো প্রয়োজন। তুষার মেহতার বক্তব্য, জনগণের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর সিদ্ধান্তের উপর আস্থা রাখা উচিত। তিনি বলেন, ‘জনগণের উচিত প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তের উপরে আস্থা রাখা। প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর সরকার সব সময়ে অসৎ উদ্দেশ্যেই কাজ করবেন এমন পূর্বধারণা নিয়ে এগোনো সঠিক নয়। যদি প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্তকে অনাস্থার চোখে দেখা হয়, তবে কি ভবিষ্যতে ক্যাবিনেট মন্ত্রী বেছে নেওয়ার জন্যেও কোনও প্রাক্তন বিচারপতি বা তৃতীয় ব্যক্তির পরামর্শ নেওয়ার নিয়ম করা হবে?’ কেবল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে বলেই সরকার সংবিধানের বিরুদ্ধে কাজ করবে, এমনটা ভাবাও ভুল বলে জানিয়েছেন তুষার।

পাল্টা সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি অনাস্থার নয়; বরং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রশ্ন। বিচারপতিরা বলেন, ‘আমরা প্রধানমন্ত্রীকে বিশ্বাস করি না, বিষয়টা এমন নয়। কিন্তু মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ ব্যক্তি হতে হবে। এখানে কি নিরপেক্ষতার প্রকাশ ঘটা জরুরি নয়? আমরা বলছি না যে, বাছাই কমিটিতে নিরপেক্ষতা নেই। আমরা শুধু বলতে চাইছি, এটা দৃশ্যমান হওয়াও জরুরি।’

এর পর শুনানির শেষ পর্যায়ে কেন্দ্রীয় সরকার মামলাটি বৃহত্তর সাংবিধানিক বেঞ্চে পাঠানোর আবেদন জানায়। তবে সেই আবেদনের বিরোধিতা করেন মামলাকারীদের আইনজীবীরা। তাঁদের দাবি, টানা ২০ দিন ধরে শুনানি চলার পর এখন বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠানোর আবেদন করে কেন্দ্র কার্যত মামলার নিষ্পত্তি বিলম্বিত করতে চাইছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি সুপ্রিম কোর্ট। আপাতত রায় সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের আগে পর্যন্ত মুখ্য নির্বাচন কমিশনার ও নির্বাচন কমিশনারদের নিয়োগ করত কেন্দ্রীয় সরকার। তবে ২০২৩ সালে সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির সাংবিধানিক বেঞ্চ রায় দেয়, এই নিয়োগ প্রক্রিয়া হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে। আদালত জানায়, সংসদে এ বিষয়ে আইন না হওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি এবং লোকসভার বিরোধী দলনেতাকে নিয়ে গঠিত কমিটি নির্বাচন কমিশনারদের বাছাই করবে। পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সরকার এ সংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করলেও, বাছাই কমিটি থেকে প্রধান বিচারপতিকে বাদ দেওয়া হয়। নতুন আইনে প্রধানমন্ত্রী, লোকসভার বিরোধী দলনেতা এবং এক কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে নিয়ে তিন সদস্যের কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়। এর ফলে কমিটির তিন সদস্যের মধ্যে দু'জনই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হওয়ায় বিরোধীদের অভিযোগ, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের নিয়ন্ত্রণ কার্যত আবারও সরকারের হাতেই ফিরে গিয়েছে। এই আইনকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়েছে।


Share