Flood

দক্ষিণবঙ্গে দুর্যোগের ঘনঘটা! ঝাড়খণ্ড-বিহারের বৃষ্টিতে ডিভিসির জল ছাড়া বাড়ল, দামোদর তীরবর্তী তিন জেলায় প্লাবনের আশঙ্কা

কলকাতা সংলগ্ন কয়েকটি নিচু এলাকাতেও জল জমে সমস্যা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে, নিচু জমিগুলিতে জল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে চাষাবাদেও।

ঝাড়খণ্ড-বিহারের বৃষ্টিতে ডিভিসির জল ছাড়া বাড়ল, দামোদর তীরবর্তী তিন জেলায় প্লাবনের আশঙ্কা।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৪:৫৮

দক্ষিণবঙ্গজুড়ে একটানা ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেই নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে ঝাড়খণ্ড ও বিহারের বৃষ্টি। অতিবৃষ্টির জেরে ওই দুই রাজ্যের বিভিন্ন জলাধার থেকে জল ছাড়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে। এর ফলে দামোদর নদের নিম্ন অববাহিকায় আশঙ্কা বাড়ছে। বিশেষ করে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া ও হুগলির দামোদর তীরবর্তী এলাকাগুলিতে পরিস্থিতির দিকে নজর রাখা হচ্ছে।

অন্য দিকে, গত কয়েক দিনে কলকাতা ও সংলগ্ন জেলাগুলিতে হওয়া বৃষ্টিতেও ভোগান্তি বাড়ছে সাধারণ মানুষের। বেশ কিছু এলাকায় নিকাশি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত না থাকায় অল্প বৃষ্টিতেই জল জমে যাচ্ছে। সেই জল নামার আগেই ফের বৃষ্টি নামায় পরিস্থিতি আরও জটিল হচ্ছে। কলকাতা সংলগ্ন কয়েকটি নিচু এলাকাতেও জল জমে সমস্যা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে, নিচু জমিগুলিতে জল দাঁড়িয়ে যাওয়ায় ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে চাষাবাদেও।

বৃহস্পতিবার ভোর থেকে কলকাতা ও শহরতলিতে দফায় দফায় কয়েক ঘণ্টা ধরে বৃষ্টি হয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত কলকাতা শহরের কোথাও জল জমার খবর পাওয়া যায়নি। যদিও সংলগ্ন জেলাগুলির বেশ কিছু এলাকায় বৃষ্টির জেরে সাধারণ মানুষ দুর্ভোগে পড়েছেন।

উত্তর ২৪ পরগনার দমদম, পানিহাটি ও বারাসতের একাধিক ওয়ার্ডে জল জমেছে। ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলেরও বেশ কিছু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। খড়দহ ও নৈহাটিতেও জল জমার খবর মিলেছে। অন্য দিকে, বনগাঁ শহর সংলগ্ন কয়েকটি এলাকায় চাষের জমিতে জল দাঁড়াতে শুরু করেছে। টানা বৃষ্টি ও ঝড়ের জেরে ইছামতী নদীর জলস্তরও বেড়েছে। তবে পরিস্থিতি এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছয়নি। জেলার কিছু নিচু এলাকায় বিক্ষিপ্ত ভাবে জল জমলেও যান চলাচলে এখনও বড় ধরনের প্রভাব পড়েনি। রেল পরিষেবা এবং সড়কপথে গণপরিবহণও স্বাভাবিক রয়েছে।

গত কয়েক দিন ধরে ঝাড়খণ্ড ও বিহারে বৃষ্টির পরিমাণ বেড়েছে। সেই বৃষ্টির জেরে ডিভিসি কর্তৃপক্ষ পশ্চিম বর্ধমানের জলাধারগুলি থেকে জল ছাড়ার পরিমাণও বাড়িয়েছে। বুধবার থেকেই মাইথন ও পাঞ্চেত জলাধার থেকে জল ছাড়া শুরু হয়েছে। বৃহস্পতিবার মাইথন জলাধার থেকে ৫৮ হাজার কিউসেক এবং পাঞ্চেত থেকে ৬০ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হচ্ছে। অর্থাৎ, দুই জলাধার মিলিয়ে মোট এক লক্ষ ১৮ হাজার কিউসেক জল দামোদর নদ দিয়ে পৌঁছোচ্ছে দুর্গাপুর ব্যারাজে। এর পাশাপাশি, আসানসোল-দুর্গাপুর শিল্পাঞ্চলে গত কয়েক দিনে হওয়া বৃষ্টির জলও এসে জমছে দুর্গাপুর ব্যারাজে। সূত্রের খবর, দুর্গাপুর ব্যারাজ থেকেও প্রায় এক লক্ষ ৪০ হাজার কিউসেক জল ছাড়া হচ্ছে। সেই জল দামোদর নদ দিয়ে পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া ও হুগলির দিকে যাচ্ছে। ফলে ওই তিন জেলার দামোদর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলিতে জল ঢোকার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রে খবর, ডিভিসি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে রাজ্য সরকারের আধিকারিকেরা ইতিমধ্যেই বৈঠক করেছেন। জলাধারগুলি থেকে আরও কতটা জল ছাড়া হতে পারে, তা জানতে ডিভিসির সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছেন তাঁরা। সম্ভাব্য পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে সেই অনুযায়ী আগাম প্রস্তুতি সেরে রাখতে প্রশাসন তৎপর হয়েছে।

এ দিকে, হুগলির আরামবাগ মহকুমার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বিভিন্ন নদীর জলস্তরও ক্রমশ বাড়ছে। ফলে আরামবাগ, খানাকুল, গোঘাট ও পুরশুড়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে খানাকুলের নিচু এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে রাতেই প্রশাসনের তরফে মাইকিং করে এলাকাবাসীকে সতর্ক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফেরিঘাটগুলিতেও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। নদীপথে যাতায়াতের সময় নৌকায় ওঠার ক্ষেত্রে যাত্রীদের লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। খানাকুলের বিধায়ক সুশান্ত ঘোষও নদীপথে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পরিস্থিতি পরিদর্শন করছেন। এরই মধ্যে ডিভিসি জল ছাড়তে শুরু করায় বন্যার আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

আরামবাগ মহকুমার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দ্বারকেশ্বর, মুণ্ডেশ্বরী, রূপনারায়ণ-সহ বিভিন্ন নদীতে ডিভিসি-র ছাড়া জল ঢুকলে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হতে পারে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা আশঙ্কা করছেন। পরিস্থিতি নিয়ে প্রশাসন ইতিমধ্যেই তৎপর হয়েছে। হুগলির জেলাশাসক খুরশিদ আলি কাদরি জেলা প্রশাসনের আধিকারিকদের নিয়ে বৈঠক করেছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় তিনি প্রয়োজনীয় নির্দেশও দিয়েছেন।

অন্য দিকে, হুগলির বেশ কিছু এলাকায় বেহাল নিকাশি ব্যবস্থার অভিযোগও উঠছে। সপ্তগ্রাম পঞ্চায়েতের চক বাঁশবেড়িয়া ও শঙ্খনগর এলাকায় রাস্তা থেকে জল নামছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, সমস্যার সমাধানে তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েতের তরফেও তেমন কোনও উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। তবে কবে নাগাদ জল-দুর্ভোগ কাটবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট করে তিনি কিছু জানাতে পারেননি। একই ছবি উত্তরপাড়া শহরেও। নিকাশি ব্যবস্থার সমস্যার জেরে শহরের একাধিক রাস্তায় জল জমে রয়েছে বলে অভিযোগ। উত্তরপাড়া স্টেট জেনারেল হাসপাতাল চত্বরেও গোড়ালি সমান জল জমেছে। সেই জল পেরিয়েই রোগী ও পরিজনদের ওপিডি থেকে জরুরি বিভাগে যাতায়াত করতে হচ্ছে।

গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে বীরভূমের কোপাই নদীতে জলস্তর বেড়েছে। তার জেরেই ফের জলমগ্ন কঙ্কালীতলা মন্দির চত্বর। পরিস্থিতি বিবেচনায় পুলিশ ইতিমধ্যেই ব্যারিকেড দিয়ে জলমগ্ন এলাকা ঘিরে দিয়েছে। এ দিকে, বিভিন্ন জলাধার থেকে জল ছাড়ার ফলে জেলার একাধিক নদীর জলস্তর আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যেই লাভপুরের কুয়ে নদী ফুলেফেঁপে উঠতে শুরু করেছে। কাঁদরকুলা থেকে বাঘসিনা যাওয়ার রাস্তা পুরোপুরি জলের তলায় চলে গিয়েছে। প্রশাসন ওই পথে যাতায়াত বন্ধ করে দিয়েছে। নদী পারাপারের জন্য রাখা হয়েছে নৌকার ব্যবস্থা। স্থানীয়দের আশঙ্কা, নদীতে জল আরও বাড়লে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। জলস্তর বিপদসীমার দিকে এগোলে কীর্ণাহারের পাশাপাশি বাঘসিনা, জয়চন্দ্রপুর, খাঁপুর, চতুর্ভুজপুর-সহ প্রায় ১৫টি গ্রাম প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্য দিকে, বৃহস্পতিবার সকালে গঙ্গার জলোচ্ছ্বাসের জেরে মালদহের কেশরপুর কালোটোন টোলার বাঁধের প্রায় ২০ মিটার অংশ ভেঙে যায়। বাঁধ ভেঙে ভূতনিতে জল ঢুকতে শুরু করেছে। ফলে এ বছরও মানিকচক ব্লকের ভূতনিচর এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইতিমধ্যেই সেচ দফতরের তরফে একটি অস্থায়ী বাঁধ তৈরি করা হয়েছে। তবে গঙ্গার জলস্তর যেভাবে বাড়ছে, তাতে ওই অস্থায়ী বাঁধ কতক্ষণ জল আটকাতে পারবে, তা নিয়েও উদ্বেগে স্থানীয় প্রশাসন ও বাসিন্দারা।


Share