Allegation of Disproportionate Asset

বিহার এসটিএফের ডিজি কুন্দন কৃষ্ণনের ১৫০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি! বিস্ফোরক ভিযোগ আরজেডি সাংসদের, তদন্তের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি , অস্বীকার পুলিশকর্তার

এসটিএফের ডিজি কুন্দন কৃষ্ণন জানান, তাঁর সম্পত্তির বিবরণের বিষয় একেবারেই স্বচ্ছ। সাংসদ সুধাকর একতরফা তথ্য তুলে ধরছেন। সাংসদের আয়ের বিভিন্ন উৎস ও বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণের বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন না।

(বাঁ দিক থেকে) বিহার পুলিশের এসটিএফের ডিজি কুন্দন কৃষ্ণন এবং আরজেডি সাংসদ সুধাকর সিংহ।
ইন্দ্রজিৎ মল্লিক, বিহার
  • শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:৩৫

বিহার পুলিশের এক শীর্ষ পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ করেছেন বক্সারের সাংসদ তথা আরজেডির নেতা সুধাকর সিংহ। তাঁর অভিযোগ, ওই পুলিশকর্তার সঙ্গে জমি মাফিয়াদের যোগ রয়েছে। আরজেডি সাংসদ সুধাকর সিংহ ওই পুলিশকর্তার বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর দফতরকে চিঠি লিখেছেন। আরজেডি সাংসদের আরও অভিযোগ, ওই শীর্ষ পুলিশকর্তা ১৫০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি করেছেন। যাঁর বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছেন তিনি বিহার পুলিশের এসটিএফের ডিজি কুন্দন কৃষ্ণন। কুন্দন ১৯৯৪ ব‍্যাচের আইপিএস অফিসার।

বিহার পুলিশের এসটিএফের ডিজি কুন্দন কৃষ্ণনের বিরুদ্ধে আরজেডি সাংসদ সুধাকর সিংহ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী, বিহারের রাজ্যপাল সৈয়দ আতা হাসনাইন, ইউনিয়ন পাবলিক সার্ভিস কমিশন (ইউপিএসসি), কেন্দ্রীয় ভিজিল্যান্স কমিশন (সিভিসি), কর্মীবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতর (ডিওপিটি) এবং লোকপাল বিচারপতি (অবসরপ্রাপ্ত) অজয় মানিকরাও খানউইলকরকে চিঠি লিখেছেন। পাঠানো চিঠিতে, পুলিশকর্তা কুন্দনের ঘোষিত ও অঘোষিত সম্পত্তি, পারিবারিক সম্পত্তি এবং তাঁর আয়ের উৎস নিয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বক্সারের সাংসদ।

সুধাকর বলেন, “আমি সমস্ত প্রাসঙ্গিক নথি ও প্রমাণপত্র তাঁদের কাছে পাঠিয়েছি। কুন্দন এবং তাঁর পরিবারের স্থাবর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ১৮৫ কোটি টাকা। চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকে তাঁর বেতন আনুমানিক পাঁচ কোটি টাকা হতে পারে। তাঁর পরিবারের সম্পত্তি প্রায় ৩০ কোটি টাকা। তাঁর ১৫০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি রয়েছে। এই সম্পত্তির উৎস তদন্ত করা উচিত।”

বক্সারের সাংসদের বিস্ফোরক দাবি, পটনায় সিনিয়র সুপারিনটেনডেন্ট অফ পুলিশ (এসএসপি) এবং পরবর্তী উচ্চপদে কর্মরত থাকার সময় বিভিন্ন জমি মাফিয়াদের সঙ্গে যোগসাজশ করে এই বিপুল সম্পত্তি অর্জন করেছেন কুন্দন কৃষ্ণন। পুলিশকর্তা কুন্দনের সম্পত্তি নিয়ে বিহার সরকারের অর্থনৈতিক অপরাধ দমন শাখা (ইওইউ) অথবা স্পেশাল ভিজিল্যান্স ইউনিটকে (এসভিইউ) দিয়ে তদন্ত করানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি। রাজ্যে লোকায়ুক্তের পদ শূন্য না থাকলে এই বিষয়টি লোকায়ুক্তের কাছে উত্থাপন করতেন বলেও দাবি করেন সুধাকর।

আরজেডি সাংসদ মনে করেন, কুন্দন ও তাঁর পরিবারের বাড়িতে তল্লাশি চালানো উচিত। মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরী এই বিষয়ে নীরব। মুখ্যমন্ত্রী যদি এমন গুরুতর বিষয়ে নীরব থাকলে তা অন্যায়কে সমর্থন করা হিসেবে গণ্য হবে। লোকায়ুক্তের শূন্যপদে দ্রুত নিয়োগের দাবিতে তিনি পটনা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হবেন বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তাঁর দাবি, দুর্নীতির মামলাগুলি যাতে তাঁর সামনে পেশ করা যায়, তাই তিনি মামলা করবেন। বলেন, “লোকায়ুক্ত নিয়োগ হলে তাঁর কাছে বিষয়টি তুলে ধরে তদন্তের দাবি জানাব।” 

পটনা, নালন্দা এবং বিহারের অন্যান্য জেলা ছাড়াও হরিয়ানার গুরুগ্রামেও কুন্দনের সম্পত্তির বিবরণ ও তার ঘোষিত মূল্য তুলে ধরেছেন আরজেডি সাংসদ। তবে তাঁর দাবি, ঘোষিত মূল্য এবং প্রকৃত বাজারদরের মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে। সাংসদ সুধাকরের অভিযোগ, বেশ কিছু জমি কুন্দনের বার্ষিক স্থাবর সম্পত্তির বিবরণীতে (আইপিআর) উল্লেখই করা হয়নি। আবার নাকি কিছু সম্পত্তির মূল্যও কম দেখানো হয়েছে।

সাংসদ বলেন, “পটনায় কুন্দন, তাঁর চিকিৎসক স্ত্রী মল্লিকা সিংহ এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে কেনা বেশ কয়েকটি জমির পাশে থাকা জমি কিনেছেন রীতেশরঞ্জন সিংহ ওরফে বিট্টু সিংহ। তিনি কে? তিনি কি কোনও ব্যবসার অংশীদার, নাকি কুন্দনের সঙ্গে তাঁর পারিবারিক বা আর্থিক সম্পর্ক রয়েছে? তা তদন্ত করা উচিত।”

সুধাকরের আরও দাবি, রাজ্যের রাজধানী ও পটনা জেলার গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় কুন্দনের স্ত্রী মল্লিকা সিংহের নামে বেশ কয়েকটি সম্পত্তি রয়েছে। সেই জমিগুলির মধ্যে কয়েকটিতে সংলগ্ন জমির ক্রেতা হিসেবে উঠে এসেছে রীতেশরঞ্জন ওরফে বিট্টু সিংহের নাম। মল্লিকার একটি জমি ভারতী ইনফ্রাটেল লিমিটেডকে লিজ দেওয়া হয়েছে। সেই লিজের শর্ত, আয় এবং আয়কর রিটার্নে তা উল্লেখ করা হয়েছে কি না, তা প্রকাশ্যে আনার দাবি জানিয়েছেন বর্ষীয়ান নেতা সুধাকর।

কুন্দন ও তাঁর স্ত্রীর কাছে প্রায় আট কোটি টাকার নগদ অর্থ, সোনা, হিরে ও অন্যান্য মূল্যবান পাথর রয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সাংসদ সুধাকর। এ সব সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য, কেনার পদ্ধতি, অর্থ প্রদানের মাধ্যম এবং অর্থের উৎস নিয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বিহারের বর্ষীয়ান নেতা।

উল্লেখ্য, ভোজপুর জেলার বিলৌটি গ্রামে মানসিক ভারসাম্যহীন সমাজকর্মী ভরতভূষণ তিওয়ারির এনকাউন্টার হয়েছিল। সাংসদের দাবি ছিল, তা ভুয়ো ছিল। ভরতের মৃত্যুর ঘটনায় কুন্দনের নাম জড়ানোর অভিযোগে সুধাকরকে আইনি নোটিস পাঠিয়েছিলেন পুলিশকর্তা কুন্দন। ওই নোটিসে প্রকাশ্য নিঃশর্ত ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানানো হয়েছিল। নোটিসে বলা হয়, ক্ষমা না চাইলে পাঁচ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি তুলে আদালতে মানহানির মামলা-সহ উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ করা হবে।

ভরতভূষণের মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক জনরোষের সৃষ্টি হয়েছিল। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা ও সাধারণ মানুষ তাঁর গ্রামে গিয়ে শ্রদ্ধা জানান। ন্যায়বিচারের দাবিও ওঠে। ঘটনার তদন্তে বিহার সরকার পটনা হাই কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিনোদকুমার সিংহের নেতৃত্বে এক সদস্যের বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠন করেছে।

অন্য দিকে, কুন্দন কৃষ্ণনের আইনি নোটিসের জবাব দিয়েছেন আরজেডি নেতা সুধাকর সিংহ। বিষয়টি নিয়ে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লা, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী এবং রাজ্যের সমস্ত সাংসদ ও বিধায়ককে চিঠি লিখেছেন তিনি। সুধাকরের অভিযোগ, জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে নিজের দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। বর্ষীয়ান নেতার দাবি, আইনসভা দ্বারা পরিচালিত নির্বাহী বিভাগের সীমা লঙ্ঘন করা উচিত নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে রক্ষা করা প্রয়োজন বলেও দাবি করেছেন তিনি।

গত ২৬ অক্টোবর কৃষকদের আন্দোলনে যোগ দিতে যাওয়ার সময় নওয়াদা জেলায় তাঁকে কয়েক ঘণ্টার জন্য আটক করে পুলিশ। তাঁকে আকবরপুর থানায় রাখা হয়। সংশ্লিষ্ট পুলিশ ও প্রশাসনিক আধিকারিকদের বিরুদ্ধে সংসদীয় অধিকার প্রয়োগের দাবি জানিয়ে লোকসভার স্পিকারকে চিঠি দিয়েছেন বক্সারের আরজেডি সাংসদ।

একটি সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে আরজেডি সাংসদের অভিযোগের বিষয়ে এসটিএফের ডিজি কুন্দন কৃষ্ণন জানান, তাঁর সম্পত্তির বিবরণের বিষয় একেবারেই স্বচ্ছ। সাংসদ সুধাকর একতরফা তথ্য তুলে ধরছেন। সাংসদের আয়ের বিভিন্ন উৎস ও বিভিন্ন ব্যাঙ্ক থেকে নেওয়া ঋণের বিষয়টি তিনি বিবেচনা করছেন না।

বিহার পুলিশের সিনিয়র আইপিএস অফিসারের কথায়, পৈতৃক সম্পত্তি থেকে তাঁর প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য আয় হয়। তাঁর স্ত্রী বিহারের সরকারি চিকিৎসক। তাঁর নিজস্ব আয়ের পাশাপাশি বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তিও রয়েছে।

সিনিয়র আইপিএস অফিসার কুন্দন বলেন, “আমি গত ৩২ বছর ধরে চাকরি করছি। নিয়মিত বিহার সরকারের কাছে আমার সম্পত্তির বিবরণ জমা দিয়েছি। সবকিছুই স্বচ্ছ। সাংসদ আমার পৈতৃক জমির একটি প্লট নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জমিটি গত ২০১২ সালে আমার বাবা লন্ডন থেকে ফিরে আসার পর আমি বিক্রি করেছিলাম। সেই টাকা দিয়ে গুরুগ্রামে ফ্ল্যাট কিনেছি।”

পুলিশকর্তা কুন্দন কৃষ্ণন আরও বলেন, “কাইমুর জেলার জমিটি প্রত্যন্ত এলাকায় অবস্থিত। চলতি বছরে আট কাঠা করে দুটি জমি কেনা হয়েছে। তাই আগের সম্পত্তির বিবরণীতে সেগুলি নেই।” তিনি সাংসদকে কটাক্ষ করে বলেন, “তিনি কোনও কোনও চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট নন। তিনি নিজের ইচ্ছামতো কথা বলছেন। মানহানিকর মন্তব্য করছেন।”


Share