Sikkim Accident

সিকিমের তিস্তা প্রকল্পে মৃত্যুমিছিল! সুড়ঙ্গ ধসে মৃত ২০, এখনও নিখোঁজ ৫, মিথেন গ্যাসে ব্যাহত উদ্ধার অভিযান

প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ধসের সময় সুড়ঙ্গের ভিতরে অন্তত ২৭ জন শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু'জন কোনওক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এখনও পর্যন্ত ২০ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ পাঁচজনের সন্ধানে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।

সিকিমের তিস্তা প্রকল্পে সুড়ঙ্গ ধসে মৃতের সংখ্যা ২০।
নিজস্ব সংবাদদাতা, সিকিম
  • শেষ আপডেট: ২২ জুলাই ২০২৬ ১১:৫৪

সিকিমের নামচি জেলায় তিস্তার নির্মীয়মাণ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে ভয়াবহ ধসের ঘটনায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২০। এখনও পাঁচ জন নিখোঁজ থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্ঘটনার পর থেকেই জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী, সেনাবাহিনী, সিকিম পুলিশ, দমকল এবং এনএইচপিসি-র বিশেষজ্ঞ দল যৌথভাবে উদ্ধার অভিযান চালিয়ে যাচ্ছে। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, ধসের সময় সুড়ঙ্গের ভিতরে অন্তত ২৭ জন শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে দু'জন কোনওক্রমে প্রাণ বাঁচিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। এখনও পর্যন্ত ২০ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। নিখোঁজ পাঁচজনের সন্ধানে উদ্ধারকাজ অব্যাহত রয়েছে।

সোমবার দুপুরে সিকিমের নামচি জেলার সামারদুং এলাকায় এনএইচপিসি-র তিস্তা স্টেজ-ছয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের নির্মীয়মাণ সুড়ঙ্গে আচমকা ধস নামে। পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের জেরে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথ ধ্বংসস্তূপে আটকে যায়, ফলে ভিতরে আটকে পড়েন বহু শ্রমিক ও প্রকল্পকর্মী। প্রশাসনের একটি সূত্রের দাবি, সুড়ঙ্গের ভিতরে জমে থাকা মিথেন গ্যাসের বিস্ফোরণ থেকেই ধসের সূত্রপাত। তবে বিস্ফোরণের কারণ এবং ধসের প্রকৃত উৎস খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

প্রাথমিকভাবে পুলিশ ও দমকলের উদ্ধারকারী দল টানেল থেকে ১৬ জন শ্রমিককে নিরাপদে বের করে আনতে সক্ষম হয়। পরে জানা যায়, ধসের স্থান থেকে বিপরীত দিকে টানেলের ভিতরে আরও ২৭ জন শ্রমিক আটকে রয়েছেন। এরপর রাতেই উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় পশ্চিমবঙ্গ ও সিকিমের এনডিআরএফের বিশেষ দল। মঙ্গলবার বিকেল পর্যন্ত ধস সরিয়ে ১৮ জনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। বুধবার সকালে আরও দু'জন শ্রমিকের দেহ উদ্ধার হওয়ায় মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২০। তবে উদ্ধার অভিযান ছিল অত্যন্ত কঠিন। ধস পেরিয়ে টানেলের ভিতরে প্রবেশ করতে গিয়ে উদ্ধারকারী দলের সদস্যরা মিথেন গ্যাসের তীব্র প্রভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। কয়েকজনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়, এমনকি কেউ কেউ জ্ঞানও হারিয়ে ফেলেন।

শুধু মিথেন গ্যাসের উপস্থিতিই নয়, সুড়ঙ্গের ভিতরে বারবার ধস নামার আশঙ্কা, পাথর-কাদা জমে থাকা এবং অত্যন্ত সংকীর্ণ পরিবেশ উদ্ধারকাজকে আরও জটিল করে তুলেছে। উদ্ধারকারী দলের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ধাপে ধাপে ধ্বংসস্তূপ সরানো হচ্ছে। ফলে গোটা অভিযান স্বাভাবিকভাবেই সময়সাপেক্ষ হয়ে উঠেছে।

প্রশাসনের আশা, নিখোঁজ পাঁচজনের সন্ধানে চলা উদ্ধার অভিযান দ্রুত শেষ করা সম্ভব হবে। তবে উদ্ধারকারী বাহিনীর বক্তব্য, পাহাড়ি এলাকার প্রতিকূল পরিস্থিতি এবং নতুন করে ধস নামার আশঙ্কার কারণে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিতে হচ্ছে।

জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার সুজাতা কুমারী বীণাপানি জানিয়েছেন, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির সদস্যদের ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সমস্ত রকম ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থলে পৌঁছেছেন জলপাইগুড়ির অতিরিক্ত জেলাশাসক এবং ট্রাফিক বিভাগের ডিএসপি।

এ দিকে সরকারি সূত্রে জানা গিয়েছে, ধসে মৃত ২০ জন শ্রমিকের মধ্যে এখনও পর্যন্ত ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। তাঁদের মধ্যে নয় জন জলপাইগুড়ির, দু'জন আলিপুরদুয়ারের, একজন পাঞ্জাবের এবং একজন সিকিমের বাসিন্দা। মৃত জলপাইগুড়ির নয় শ্রমিকের বাড়ি মেটেলি ও বিন্নাগুড়ি এলাকায়। অন্যদিকে, নিখোঁজদের তালিকায় রয়েছেন ৪৩ বছর বয়সি কেরলের ভূতত্ত্ববিদ (জিওলজিস্ট) অনীশ মোহন।

সিকিমের নামচির তিস্তা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে সুড়ঙ্গ ধসের ঘটনায় উদ্ধারকাজের অগ্রগতি নিয়ে নিয়মিত নজর রাখছেন মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং। তিনি প্রশাসনের সব দফতরকে দ্রুত ও সমন্বিতভাবে উদ্ধার অভিযান চালানোর নির্দেশ দিয়েছেন। পাশাপাশি, দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবারের জন্য চার লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা করেছেন।

এ দিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ফোনে মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাংয়ের সঙ্গে কথা বলে গোটা পরিস্থিতির খোঁজ নেন এবং কেন্দ্রের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নিহতদের প্রত্যেকের পরিবারকে দু'লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।

এনএইচপিসি জানিয়েছে, সুড়ঙ্গে আটকে পড়া কর্মীদের নিরাপদে উদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে অভিযান চালানো হচ্ছে। সংস্থার শীর্ষ কর্তারা ঘটনাস্থলে থেকে উদ্ধারকাজের তদারকি করছেন। পাশাপাশি, ধসের প্রকৃত কারণ জানতে বিস্তারিত তদন্তও শুরু করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

এ দিকে, সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিকিমের মুখ্যমন্ত্রী প্রেম সিং তামাং জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গ ধসের কারণ অনুসন্ধানে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

২০২৩ সালের নভেম্বরে উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারা-বারকোট সুড়ঙ্গে ধস নেমে ৪১ জন শ্রমিক আটকে পড়েছিলেন। ১২ নভেম্বর ঘটে যাওয়া সেই দুর্ঘটনার পর টানা প্রায় ৪০০ ঘণ্টা ধরে চলে উদ্ধার অভিযান। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় ধ্বংসস্তূপের মধ্যে পাইপ বসিয়ে শ্রমিকদের কাছে নিয়মিত খাবার, জল ও অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া হয়। অবশেষে ১৭ দিনের রুদ্ধশ্বাস অভিযানের শেষে ৪১ জন শ্রমিককেই জীবিত ও সম্পূর্ণ নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। উল্লেখযোগ্যভাবে, ওই দুর্ঘটনায় কোনও শ্রমিকের মৃত্যু হয়নি।


Share