Supreme Court

বাবা-মায়ের বেতনের অঙ্কে নির্ধারণ করা যাবে না ‘ক্রিমি লেয়ার’, কেন্দ্রের দু’বছরের আর্জি খারিজ, ওবিসি সংরক্ষণে রায় সুপ্রিম কোর্টের

এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের চাকরির পদমর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানকেই গুরুত্ব দিতে হবে। গত ১১ মার্চ এই মর্মে দেওয়া ঐতিহাসিক রায়ই শুক্রবার বহাল রাখল শীর্ষ আদালত।

সুপ্রিম কোর্ট।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ০৬ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:৩৯

ওবিসি সংরক্ষণে ‘ক্রিমি লেয়ার’ নির্ধারণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিল সুপ্রিম কোর্ট। বাবা-মায়ের বেতনের অঙ্কের ভিত্তিতে কোনও প্রার্থীকে সচ্ছল শ্রেণি বা ‘ক্রিমি লেয়ার’-এর অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না। এ ক্ষেত্রে অভিভাবকের চাকরির পদমর্যাদা ও সামাজিক অবস্থানকেই গুরুত্ব দিতে হবে। গত ১১ মার্চ এই মর্মে দেওয়া ঐতিহাসিক রায়ই শুক্রবার বহাল রাখল শীর্ষ আদালত। রায় কার্যকর করার জন্য কেন্দ্রের দু’বছর সময় চাওয়ার আবেদনও খারিজ করে দিয়েছে বিচারপতি পি এস নরসিংহ এবং বিচারপতি আর মহাদেবনের বেঞ্চ। তবে নির্দেশ কার্যকর করার জন্য কেন্দ্রকে আরও আট সপ্তাহ সময় দেওয়া হয়েছে।

ওবিসি সংরক্ষণের নিয়ম অনুযায়ী, আর্থিক ও সামাজিক ভাবে পিছিয়ে থাকা নন-ক্রিমি লেয়ার শ্রেণির প্রার্থীরাই সরকারি চাকরি ও শিক্ষাক্ষেত্রে সংরক্ষণের সুবিধা পান। অন্য দিকে, ক্রিমি লেয়ারের অন্তর্ভুক্ত প্রার্থীরা এই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। ১৯৯৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় সরকারের জারি করা নির্দেশিকা অনুযায়ী, ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের ক্ষেত্রে অভিভাবকের বেতন এবং কৃষিজাত আয়কে মোট আয়ের হিসাবের বাইরে রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ, শুধু উপার্জনের পরিমাণ নয়, অভিভাবকের চাকরির পদমর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান ছিল বিবেচ্য।

কিন্তু ২০০৪ সালের ১৪ অক্টোবর কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ ও প্রশিক্ষণ দফতর (ডিওপিটি) একটি ব্যাখ্যামূলক নির্দেশিকা জারি করে। সেখানে বলা হয়, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, ব্যাঙ্ক এবং বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত অভিভাবকদের বেতন ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণের সময় আয়ের হিসাবে যুক্ত হবে। অথচ সমতুল্য পদে কর্মরত কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বেতন সেই হিসাবের বাইরে রাখা হয়। এর ফলে সরকারি কর্মচারীদের সন্তানদের তুলনায় রাষ্ট্রায়ত্ত ও বেসরকারি সংস্থায় কর্মরত অভিভাবকদের সন্তানদের ক্ষেত্রে বৈষম্য তৈরি হয়। বেতনের অঙ্ক বেশি হওয়ায় বহু যোগ্য ওবিসি প্রার্থী সংরক্ষণের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন।

এই বৈষম্য নিয়েই ‘ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া বনাম রোহিত নাথন’ মামলায় গত ১১ মার্চ গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানায়, অভিভাবকের পদের সমতা বিচার না করে শুধুমাত্র বেতনের অঙ্কের ভিত্তিতে ক্রিমি লেয়ার নির্ধারণ করা যায় না। এতে সরকারি এবং রাষ্ট্রায়ত্ত বা বেসরকারি সংস্থার কর্মীদের সন্তানদের মধ্যে অসাম্য তৈরি হয়। একই সঙ্গে ডিওপিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, ভুল নিয়মের কারণে সংরক্ষণ থেকে বঞ্চিত যোগ্য ওবিসি প্রার্থীদের নিয়োগের জন্য ছ’মাসের মধ্যে অতিরিক্ত পদ তৈরি করতে হবে।

শুক্রবার সেই রায় কার্যকর করতে কেন্দ্রের দু’বছর সময় চাওয়ার আবেদন খারিজ করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। তবে আদালত স্পষ্ট করেছে, ১১ মার্চের আগে যেসব নিয়োগপ্রক্রিয়া বা পরীক্ষা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছে, সেগুলির ক্ষেত্রে এই রায় নতুন করে কার্যকর হবে না। মামলাকারী যোগ্য প্রার্থীদের নিয়োগের ফলে অন্য কর্মীদের সিনিয়রিটি বা পদমর্যাদাতেও কোনও প্রভাব পড়বে না।

তবে ১১ মার্চের পর থেকে চলা নিয়োগপ্রক্রিয়ায় পুরনো ১৯৯৩ সালের নিয়মই কার্যকর হবে। ফলে ২০২৫ সালের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় নির্বাচিত ওবিসি প্রার্থীদের সার্ভিস বণ্টনের ক্ষেত্রেও সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ মেনে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এ ছাড়া, একই ধরনের বঞ্চনার অভিযোগে বিভিন্ন আদালত ও ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মামলাগুলির নিষ্পত্তিও এই রায়ের ব্যাখ্যা মাথায় রেখে করা যাবে।

শুনানিতে কেন্দ্রের অতিরিক্ত সলিসিটর জেনারেল ঐশ্বর্যা ভাটি যুক্তি দিয়েছিলেন, পদের সমতা নির্ধারণ এবং দেশজুড়ে অভিন্ন নীতি তৈরির জন্য সরকারের অন্তত দু’বছর সময় প্রয়োজন। অন্যথায় ২০১২ সাল থেকে হওয়া নিয়োগ, ক্যাডার বণ্টন, সিনিয়রিটি এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হতে পারে। রেল, ব্যাঙ্ক, ডাক বিভাগ ও আধাসামরিক বাহিনীর নিয়োগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল কেন্দ্র।

অন্য দিকে, প্রার্থীদের আইনজীবী পি উইলসন কেন্দ্রের আবেদনের বিরোধিতা করে অভিযোগ করেন, আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে ইচ্ছাকৃত ভাবে দেরি করা হচ্ছে। দু’পক্ষের বক্তব্য শোনার পর কেন্দ্রের দু’বছরের আর্জি খারিজ করে আট সপ্তাহের মধ্যে রায় কার্যকরের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।


Share