Police Officer Fined

গাঁজা ব‍্যবসায়ীকে অপহরণ মামলায় আদালতের নির্দেশ অমান্য, বিহারের প্রাক্তন পুলিশ সুপারকে ‘১ টাকা’ জরিমানা করল আদালত, সার্ভিস রেকর্ডে নথিভুক্ত করতে নির্দেশ

বিচারক অনিল কুমার বলেন, “এই সমস্যা শুধুমাত্র যে বিহারে সীমাবদ্ধ রয়েছে এমনটা নয়। তামিলনাড়ুর নামাক্কাল জেলার এক জেলাশাসকের ক্ষেত্রেও আদালতের একাধিক নির্দেশ এবং শোকজ নোটিসের জবাব না দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। পরে ওই অভিযুক্ত জেলাশাসক আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন।”

আইপিএস অফিসার রোশন কুমার।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৮ অক্টোবর ২০২৬ ০১:১৫

আদালতের নির্দেশ ইচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য করার অভিযোগে বিহারের রোহতাসের তৎকালীন পুলিশ সুপার রোশন কুমারকে আদালত অবমাননার মামলায় দোষী সাব্যস্ত করেছে একটি বিহারের আদালত। প্রতীকী শাস্তি হিসেবে তাঁকে ‘১ টাকা’ জরিমানা করা হয়েছে। সেই জরিমানার অর্থ তাঁর বেতন থেকে আদায় হবে। দোষী সাব্যস্ত হওয়ার বিষয়টি তাঁর সার্ভিস রেকর্ডে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচারক অনিল কুমার গত ১৭ আগস্ট রোশন কুমারের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন। অভিযোগ, পুলিশ সুপার আদালতের নির্দেশ মেনে চলতে ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁকে শোকজ করে নোটিস দেওয়া হয়েছিল। তারও জবাব পুলিশ সুপার দেননি। তাই আদালত রোশনের বিরুদ্ধে এই পদক্ষেপ করেছে।

আদালত রায় দিতে গিয়ে রোশন কুমারের আচরণকে অহংকারী, উদ্ধত ও একগুঁয়ে বলে মন্তব্য করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, তিনি শুধু বারবার ইচ্ছাকৃত ভাবে আদালতের নির্দেশ শুধু অমান্য করেননি, বরং একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করে আদালতের ওপর চাপ সৃষ্টি করার চেষ্টা করেছেন। এমনকী, মামলার প্রক্রিয়া থামানোর চেষ্টা করেছিলেন বলে প্রমাণিত হয়েছে।

আদালতের আরও বক্তব্য, পুলিশ সুপার রোশনের পূর্বের আচরণ এবং বিচার চলাকালীন আচরণ, বিশেষ করে সাক্ষ্য দেওয়ার জন্য আদালতে হাজির না হওয়া, তাঁর “হঠকারী, অহংকারী ও আত্মকেন্দ্রিক মনোভাবের” পরিচয় দেয়। ফলে তাঁর প্রতি কোনও সহানুভূতি দেখানোর সুযোগ নেই বলেও আদালত জানায়।

এই ঘটনার পরে আদালত মনে করেছে, কেন্দ্রীয় কর্মীবর্গ এবং প্রশিক্ষণ দফতরকে আইএএস এবং আইপিএস আধিকারিকদের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা পর্যালোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। তা যাতে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় সেই বিষয়টি প্রয়োজনীয়তা বিবেচনা করতে বলেছে বিহারের আদালতের বিচারক।

বিচারক অনিল কুমার বলেন, “এই সমস্যা শুধুমাত্র যে বিহারে সীমাবদ্ধ রয়েছে এমনটা নয়। তামিলনাড়ুর নামাক্কাল জেলার এক জেলাশাসকের ক্ষেত্রেও আদালতের একাধিক নির্দেশ এবং শোকজ নোটিসের জবাব না দেওয়ার ঘটনা রয়েছে। পরে ওই অভিযুক্ত জেলাশাসক আদালতে নিঃশর্ত ক্ষমা চেয়েছিলেন।”

আদালত আরও উল্লেখ করে, আইএএস আধিকারিক, বিশেষ করে জেলাশাসকদের নিয়েও তাদের অভিজ্ঞতা সবসময় ভালো নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এক্সিকিউশন মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিচারক।

বিচারক এই মামলায় বিহার পুলিশের ডিজি এবং রাজ্যের মুখ্যসচিবকেও ভর্ৎসনা করেছে।আদালত জানায়, রোহতাসের তৎকালীন পুলিশ সুপারের বিরুদ্ধে নোটিস এবং শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হলেও বিহার পুলিশের ডিজি বা মুখ্যসচিবের তরফে কোনও নথি বা রিপোর্ট আদালতেই জমা দেওয়া হয়নি। এমন আচরণে প্রশাসনের উদাসীনতা, নিষ্ক্রিয়তা এবং জেলা আদালতের প্রতি অসম্মান নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিচারক। আদালতের বক্তব্য, গোটা প্রশাসনকে কার্যত নিষ্ক্রিয় ছিল। আদালতের প্রতি উদাসীন দেখে শেষ পর্যন্ত ‘নির্দেশ ইচ্ছাকৃত ভাবে অমান্য’ করার অভিযোগ এনেছে। যার ফলে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়েছে। আইনের শাসনকে অবজ্ঞা করার অভিযোগে অবমাননার মামলা শুরু করতে বাধ্য হয়েছে আদালত।

অপহরণ মামলাকে কেন্দ্র করে এই বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছিল। ওই মামলায় ১০ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল রোহতাস জেলা আদালত। মামলার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী, অর্থাৎ অপহৃত ব্যক্তি এবং তাঁর অভিযোগকারী ছেলে পরবর্তীতে তাঁদের বক্তব্য থেকে সরে যায়। তার পরেও আদালত অভিযুক্তদের দোষী সাব্যস্ত করে। এরপর তৎকালীন রোহতাসের পুলিশ সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল— অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক অপরাধের রেকর্ড সংগ্রহ করতে, একটি এফআইআর দায়ের করতে এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার অভিযোগে ভুক্তভোগীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে।

আদালতের দাবি অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিকে দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণের জন্য অপহরণ করা হয়েছিল। পরে তিনি ২০ লক্ষ টাকা পাওয়ার পর তাঁর বক্তব্য পরিবর্তন করেন। আদালত আরও জানায়, বিচার চলাকালীন প্রমাণে ওই ব্যক্তির গাঁজা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার বিষয়টি উঠে আসে। তাঁর ছেলে নাকি দীপাবলির আগে জুয়ার মাধ্যমে ১ কোটি টাকা জিতেছিলেন। যা তাঁর বাবাকে অপহরণের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে আদালতে উঠে আসে।

সেই মামলায় আদালতে রিপোর্ট দেয় জেলা পুলিশের সুপার। সেটা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে আদালত। আদালতের অভিযোগ, মামলাটি নিষ্পত্তি হওয়ার প্রায় এক মাস পরে তৎকালীন পুলিশ সুপার একটি রিপোর্ট জমা দেন। কিন্তু সেই রিপোর্টে অভিযুক্তদের সাম্প্রতিক অপরাধের রেকর্ড ছিল না। রিপোর্টটি মূলত কেস ডায়েরি থেকে বয়ান কপি করা হয়েছিল বলে আদালত মন্তব্য করে।

পরবর্তীতে আদালত পর্যবেক্ষণ করে, পুলিশ সুপার আদালতের নির্দেশগুলি যথাযথ ভাবে পালন করেননি। গত জুলাই মাসে পাঠানো শোকজ নোটিসেরও জবাব তৎকালীন পুলিশ সুপারের রোশন কুমার দেননি। এরপরই তাঁর বিরুদ্ধে ‘ইচ্ছাকৃত ভাবে আদালতের নির্দেশ অমান্য’ এবং আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার অভিযোগ এনে অবমাননার মামলা শুরু হয়।

শেষ পর্যন্ত আদালত প্রাক্তন পুলিশ সুপার রোশন কুমারকে দোষী সাব্যস্ত করে ‘১ টাকা’ জরিমানার নির্দেশ আদালত দিয়েছে। সেই টাকা ওই পুলিশকর্তার বেতন থেকে তা আদায় করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই দোষের বিষয়টি পুলিশ সুপার পদমর্যাদার আধিকারিককের সার্ভিস রেকর্ডে নথিভুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।


Share