Supreme Court

‘তদন্ত চলাকালীন মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কাম্য নয়,’ আইপ‍্যাক মামলায় পর্যবেক্ষণ সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির

আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীর উদ্দেশ্যে বলেন, "এই মামলা বা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, রাজ্য বা কেন্দ্রের মধ্যেকার বিরোধ নয়। এখানে কোনও মতবিরোধ নেই। একজন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী, তদন্তের মাঝে হঠাৎ করে ঢুকে পড়লেন। এটা কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করতে পারেন না। এভাবে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করা যায় না। এভাবে গণতন্ত্রেরমুখ বন্ধ করা যায় না।"

সুপ্রিম কোর্ট
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ২২ এপ্রিল ২০২৬ ০৫:৫৪

আইপ্যাক মামলায় তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করল সুপ্রিম কোর্ট। সংস্থার কর্ণধারের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চলাকালীন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হস্তক্ষেপকে একেবারের কাম্য নয় বলে মন্তব্য করছে দেশের শীর্ষ আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এ ভাবে তদন্ত চলাকালীন ঢুকে পড়া গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর। এতে গণতান্ত্রিক কাঠামো বিপন্ন হতে পারে বলেও আশঙ্কা করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

বিচারপতি প্রশান্তকুমার মিশ্র আগেও মুখ্যমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামীর উদ্দেশ্যে বলেন, "এই মামলা বা অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ, রাজ্য বা কেন্দ্রের মধ্যেকার বিরোধ নয়। এখানে কোনও মতবিরোধ নেই। তিনি একজন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। তদন্তের মাঝে হঠাৎ করে ঢুকে পড়েছিলেন। এটা কোনও রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করতে পারেন না। এ ভাবে গণতন্ত্রকে বিপন্ন করা যায় না। এ ভাবে গণতন্ত্রেরমুখ বন্ধ করা যায় না।"

শুনানিতে আদালত আরও জানায়, মুখ্যমন্ত্রীর এমন আচরণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তাঁর এমন আচরণ গণতন্ত্রের পক্ষে ঠিক নয় বলে পর্যবেক্ষণে জানান বিচারপতি মিশ্র। তিনি বলেন, "আপনারা বিশিষ্ট মানুষজনের চিন্তাধারার উল্লেখ করছেন। তাঁরা সংবিধানের প্রণেতা। তাঁরা সংবিধানকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁরা হয়ত কখনও চিন্তাই করতে পারেননি যে একদিন এমন অবস্থা আসবে। একজন ক্ষমতাসীন মুখ্যমন্ত্রী তদন্তের মাঝখানে ঢুকে পড়বেন। তারপরে তাতে হস্তক্ষেপ করবেন।" শীর্ষ আদালত আরও বলে, "সুপ্রিম কোর্টকে এই ধরনের মন্তব্য করতে বাধ্য করবেন না। সুপ্রিম কোর্টে যখন কোনও ঘটনার বিচার হয়, রায়দান করা হয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিচারবিবেচনা করে তার পরই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত নেন।"

এ দিন শুনানিতে আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী বিভিন্ন ঐতিহাসিক প্রসঙ্গ তুললে আদালত জানায়, অতীতে এমন নজির নেই। একইসঙ্গে তদন্ত চলাকালীন কেন্দ্রীয় সংস্থার আধিকারিকদের উপর হামলার অভিযোগ নিয়েও প্রশ্ন তোলে আদালত এবং বলে, কর্তব্যরত আধিকারিকদের বিরুদ্ধে এমন আচরণ যুক্তিযুক্ত নয়।

সিদ্ধার্থ লুথরা জানান, প্রথমে হাই কোর্টে যাওয়া উচিত হয়নি। তদন্তকারীদের উচিত ছিল ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যাওয়ার। আর তাতেই মোথাবাড়ির প্রসঙ্গ উঠে আসে। আদালত জানায়, পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি কী, সে ব্যাপারে তাঁরা অবগত। বিচারপতিদের চোখ বন্ধ নেই। অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে অভূতপূর্ব পদক্ষেপ করতে হয়। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতি জানে আদালত। সেটাও দেখা হচ্ছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী হস্তক্ষেপ করতে হয় আদালতকে। এই মুহূর্তে যা পরিস্থিতি, তাতে চোখ বন্ধ করে থাকা যায় না।

প্রসঙ্গত, গত ৮ জানুয়ারি কয়লাচুরি কাণ্ডে টাকা পাচার মামলার তদন্তে আইপ্যাকের অফিস এবং কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে ইডি তল্লাশি চালায়। সেই সময় মুখ্যমন্ত্রী সেখানে যান এবং অভিযোগ ওঠে, কিছু নথি ও ইলেকট্রনিক সামগ্রী সরিয়ে নেওয়া হয়। যদিও মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, সেগুলো তাঁর দল সংক্রান্ত তথ্য ছিল। মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কলকাতা এবং রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তারা ছিলেন। ইডি জানিয়েছে, এই তল্লাশি ২০২০ সালের একটি কয়লাপাচার মামলার তদন্তের অংশ। যেখানে ব্যবসায়ী অনুপ মাজির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। সংস্থার দাবি, একটি চক্র ইসিএল এলাকার কয়লা চুরি করে অবৈধভাবে বিক্রি করত।

এই প্রেক্ষিতে ইডি সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে জানায়, তাদের তদন্তে বাধা দেওয়া হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সরিয়ে ফেলা হয়েছে। আদালত ইতিমধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী, প্রাক্তন ডিজিপি রাজীব কুমার-সহ সংশ্লিষ্টদের নোটিশ জারি করেছে।

অন্যদিকে, রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তল্লাশিতে কোনো বাধা দেওয়া হয়নি এবং ইডি-র আবেদন গ্রহণযোগ্য নয়, কারণ অনুচ্ছেদ ৩২ সাধারণত নাগরিকদের মৌলিক অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।

এই নিয়ে আদালতে আইনি বিতর্ক চলতে থাকে। সিনিয়র আইনজীবী অভিষেক মনু সিংভি যুক্তি দেন, ইডির কোনো মৌলিক অধিকার নেই, তাই তারা ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদের অধীনে আবেদন করতে পারে না। অন্যদিকে আদালত প্রশ্ন তোলে, ইডি কর্মকর্তারা কি শুধুমাত্র পদমর্যাদার কারণে নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন? মামলার শুনানি বৃহস্পতিবারও চলবে।


Share