Illegal Arrest

লিখিত ভাবে কারণ না জানালে গ্রেফতার বেআইনি, পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে হবে বিভাগীয় তদন্তের, সমস্ত রাজ্যের পুলিশ প্রধানদের নির্দেশ শীর্ষ আদালতের

সোমবার একটি মামলায় এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল দেশের শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, যদি এমন কোনও ঘটনা ঘটে তা হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু করতে হবে।

প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০১:০০

হেফাজতে নেওয়ার সময় অভিযুক্তকে লিখিত ভাবে গ্রেফতারির কারণ জানানো বাধ্যতামূলক। যদি না হয় তা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে গ্রেফতার একেবারেই বেআইনি এবং অসাংবিধানিক বলে গণ্য হবে। সোমবার একটি মামলায় এমনই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করল দেশের শীর্ষ আদালত। একই সঙ্গে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, যদি এমন কোনও ঘটনা ঘটে তা হলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও শুরু করতে হবে।

মামলাটি শিরোমণি আকালি দলের মুল্লানপুর ডাকাহ বিধানসভা কেন্দ্রের ইনচার্জ জসকরণজিৎ সিংয়ের গ্রেফতারি সংক্রান্ত। নাবালিকার যৌন নিগ্রহের অভিযোগে শিরোমণি আকালি দলের নেতাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। অভিযোগ, কেন তাঁকে গ্রেফতার করা হল সেই সময় তাঁকে কারণ জানানো হয়নি। এরপরে নিম্ন আদালত এই গ্রেফতারিকে বেআইনি ঘোষণা করে। তার পরে অবিলম্বে জসকরণজিতকে মুক্তির নির্দেশ দেয়। নিম্ন আদালতের সেই নির্দেশে পঞ্জাব ও হরিয়ানা হাই কোর্ট স্থগিতাদেশ দেয়। তার পরে হাই কোর্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে দেশের শীর্ষ আদালতের দ্বারস্থ হন তিনি।

সোমবার বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া এবং বিচারপতি অতুল এস চন্দুরকরের বেঞ্চে এই মামলার শুনানি হয়েছে। শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণ, সংবিধানের ২২(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গ্রেফতারির কারণ লিখিত ভাবে জানানো অভিযুক্তের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার লঙ্ঘিত হলে গ্রেফতারি বৈধ বলে গণ্য করা যাবে না। এমনকী, পরবর্তীতে আদালতে চার্জশিট দাখিল প্রথম দফার বেআইনি গ্রেফতার বৈধ হয়ে যাবে না।

আদালতের নির্দেশ, সংবিধানের ২২(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের কারণে কোনও অভিযুক্তকে মুক্তি দেওয়ার পর তদন্তকারী সংস্থা যদি তাঁকে পুনরায় হেফাজতে নিতে চায়, তা হলে সরাসরি গ্রেফতার করা যাবে না। কেন তাঁকে আবার হেফাজতে নেওয়া হচ্ছে লিখিত ভাবে কারণ অভিযুক্তকে জানাতে হবে। সে ক্ষেত্রে কেন আবার অভিযুক্তকে হেফাজতে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা, প্রথম বার গ্রেফতার করার সময় কারণ কেন জানানো হয়নি— সমস্ত ব্যাখ্যা দিয়ে সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন করতে হবে। ওই আবেদনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও থাকতে হবে বলে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে।

দেশের শীর্ষ আদালত মনে করছে, যে কর্তৃপক্ষ প্রথম বার সাংবিধানিক আইন লঙ্ঘন করতে পারে, সেই একই কর্তৃপক্ষের হাতে পুনরায় গ্রেফতারের সিদ্ধান্ত পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া যাবে না। তাই পুলিশের আবেদনটি ম্যাজিস্ট্রেট দ্রুত বিবেচনা করবেন। প্রয়োজন মনে করলে তদন্তকারী সংস্থাকে পুনরায় গ্রেফতারের অনুমতি দিতে পারবেন বলে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিয়েছে।

শুধু তাই নয়, সোমবার প্রশাসনিক ক্ষেত্রেও একাধিক নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। কোনও পুলিশ আধিকারিক যদি গ্রেফতারির কারণ লিখিত ভাবে জানাতে যদি ব্যর্থ হন, অভিযুক্তের পরবর্তী হেফাজতের জন্য তাঁকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিতে হবে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে মামলার তদন্তের দায়িত্ব অন্য আধিকারিকের হাতে তুলে দিতে হবে। অভিযুক্তকে গ্রেফতারের কারণ না জানানোর ঘটনায় সংশ্লিষ্ট পুলিশ আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিতে হবে বলে স্পষ্ট জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। তদন্তে যদি ওই আধিকারিকের বিরুদ্ধে বিরূপ সিদ্ধান্ত আসে, তা হলে তাঁর বিরুদ্ধে বিভাগীয় পদক্ষেপ করতে হবে। পাশাপাশি বিষয়টি তাঁর সার্ভিস বুকে নথিভুক্ত করতেও নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত।

রায় ঘোষণার সময় বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া বলেন, এই মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠেছে— সংবিধানের ২২ অনুচ্ছেদের (১) এবং (২) ধারার লঙ্ঘনের শিকার কোনও অভিযুক্তকে পুনরায় গ্রেফতার করা যায় কি না এবং কোন পরিস্থিতিতে তা করা যাবে ও সে ক্ষেত্রে কী পদ্ধতিতে মানতে হবে? আদালত জানিয়েছে, গ্রেফতারের কারণ অবশ্যই লিখিত ভাবে। অভিযুক্ত যে ভাষা বোঝেন, সেই ভাষায় জানাতে হবে। সেই কারণের একটি অনুলিপি কোনও ব্যতিক্রম ছাড়াই দ্রুত অভিযুক্তকে দিতে হবে।

সুপ্রিম কোর্টের বক্তব্য, এটি কোনও প্রক্রিয়াগত বিষয় নয়। সংবিধানের ২২(১) অনুচ্ছেদের অধীনে গ্রেফতারের কারণ জানানো একজন ব্যক্তির মৌলিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। এই অধিকার লঙ্ঘিত হলে অভিযুক্তকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। এই মুক্তি জামিনে মুক্তি নয়, বরং বেআইনি ও অসাংবিধানিক হেফাজত থেকে মুক্তি। আদালত আরও স্পষ্ট করেছে, এই সাংবিধানিক সুরক্ষা কোনও নির্দিষ্ট আইনের মামলার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় দণ্ডবিধির অধীনে অপরাধ হোক বা কোনও বিশেষ আইনের অধীনে মামলা— সব ক্ষেত্রেই অভিযুক্তের ২২ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা প্রযোজ্য।

রায়ে এ-ও বলা হয়েছে, সংবিধানের বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে অভিযুক্তের কোনও ক্ষতি হয়েছে কি না, তা দেখার প্রয়োজন নেই। কারণ, ২২(১) অনুচ্ছেদে প্রদত্ত সুরক্ষা নিজেই একটি মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার। সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ২২(২) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদ্ধতি অনুসরণ করতেই হবে। গ্রেফতারের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অভিযুক্তকে বিচারবিভাগীয় ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে হাজির করাতে হবে। সাংবিধানিক নির্দেশও কঠোর ভাবে পালন করতে হবে। পাশাপাশি, পরিস্থিতি অনুযায়ী ২২(২) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনের ঘটনায় হাই কোর্ট জনআইনের প্রতিকার হিসেবে অভিযুক্তকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিতে পারে বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।

এই রায়ের একটি অনুলিপি দেশের সমস্ত রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পুলিশের ডিজিদের মহানির্দেশকদের কাছে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছে শীর্ষ আদালত। আদালতের পর্যবেক্ষণ, কোনও অপরাধের গুরুত্ব বা সমাজের ওপর তার প্রভাব যতই হোক না কেন, কোনও নাগরিকের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা খর্ব করার ক্ষেত্রে সংবিধান নির্ধারিত পদ্ধতি কঠোর ভাবে অনুসরণ করতেই হবে। সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গে কোনও পরিস্থিতিতেই আপস করা যায় না।


Share