Rajesh Exports

সোনা ব‍্যবসায়ী সংস্থা রাজেশ এক্সপোর্টস-এর বিরুদ্ধে ১৫ লক্ষ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির অভিযোগ, প্রোমোটারকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করল সেবি

ওই সংস্থার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ আনা হয়েছে। সেবি জানিয়েছে, টানা পাঁচ বছর ধরে ওই সংস্থাটি তাদের আর্থিক অবস্থা সংক্রান্ত তথ্যকে বিকৃত করে পেশ করেছে। বিদেশের সহযোগী সংস্থাগুলির দ্বারা নিজেদের অর্থনৈতিক কার্যাবলীকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে।

রাজেশ এক্সপোর্টস-এর বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করল সেবি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬ ০৫:১৯

দালাল স্ট্রিট থেকে বড় ধরনের দুর্নীতির খবর সামনে এসেছে। এতদিন দেশের অন্যতম সেরা ‘সাকসেস স্টোরি’ হিসেবে উচ্চারিত হওয়া রাজেশ এক্সপোর্টেস-এর বিরুদ্ধেই ১৫ লক্ষ কোটি টাকার কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, অভিযুক্ত সংস্থা এবং সংস্থার প্রোমোটার তথা চেয়ারম্যানকে আপাতত বাজারে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেবি।

রাজেশ এক্সপোর্টে সদর দফতর বেঙ্গালুরুতে। এই সংস্থার দাবি ছিল, তাঁরা বিশ্বমানের সোনা এবং রত্ন বিক্রেতা সংস্থা। তা দেখিয়ে এই বাজারে জায়গা করে নিয়েছিল। জানা গিয়েছে, গত ৩ জুন সেবি এই সংস্থার ওপর নিষেধাজ্ঞা বসিয়েছে। আর তার পরই, বৃহস্পতিবার বাজারে তাদের শেয়ার দরে ৫ শতাংশ পতন ঘটেছে। সেবি জানিয়েছে, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। এই বিপুল অঙ্কের কেলেঙ্কারি বিশ্বের বহু দেশের বার্ষিক অর্থনৈতির উৎপাদনও ওই অঙ্কের ধারেকাছে নেই।

ওই সংস্থার বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ আনা হয়েছে। সেবি জানিয়েছে, টানা পাঁচ বছর ধরে ওই সংস্থাটি তাদের আর্থিক অবস্থা সংক্রান্ত তথ্যকে বিকৃত করে পেশ করেছে। বিদেশের সহযোগী সংস্থাগুলির দ্বারা নিজেদের অর্থনৈতিক কার্যাবলীকে বাড়িয়ে দেখানো হয়েছে। কারণ, যাতে তাদের ঘোষিত আয়ের হিসেব ছিল ১৫৮.৩ বিলিয়ন ডলার বা ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকা। কিন্তু এই বিস্ময়কর অঙ্ক দেখেও এতদিন কারও মনে সন্দেহ কেন জাগল না তা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

সেবি বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে সেবির তদন্ত চূড়ান্তও নয়। কিন্তু গোটা বিষয়টি সামনে আসতেই দালাল স্ট্রিটে আলোড়ন পড়ে গিয়েছে। বিভিন্ন সংস্থার প্রদত্ত তথ্য, তাদের ওপর তদারকি এবং বিনিয়োগকারীদের ভবিষ্যৎ ও সুরক্ষা নিয়ে সর্বত্র উদ্বেগ ছড়িয়েছে। তবে একদিনে যে এমনটা ঘটেনি তা কার্যত স্পষ্ট।

২০২৪ সালের ১১ মার্চ প্রথমবার সংস্থার শেয়ারহোল্ডারদের তরফে সেবির কাছে অভিযোগ জানানো হয়েছিল। তাঁদের দাবি, দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে অনেকের পাওনা বাকি রয়েছে। কিছুতেই টাকা আদায় করা যাচ্ছে না। জানা গিয়েছে, ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে সেবি বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করে। বিডিও নামে এক বেসরকারি সংস্থাকে দিয়ে ফরেন্সিক অডিট করা হয়। সব কিছু ওই সংস্থাই খতিয়ে দেখে। তবে ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার অঙ্কই সকলকে ভাবিয়ে তুলেছে।  

সেবির তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ অর্থবর্ষে পর্যন্ত সময়কালে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর প্রায় সম্পূর্ণ আয়ই বিদেশের সহযোগী সংস্থাগুলির কাছ থেকে আসে। মোট ঘোষিত আয় এবং ব‍্যায়ের ৯৭-৯৯ শতাংশই বিদেশ থেকে এসেছে। সুইজারল্যান্ডের সংস্থা ভলকাম্বি এসএ সংস্থার ভূমিকা তাতে সবচেয়ে বেশি ছিল। রাজেশ এক্সপোর্টস-কে বহু বছর আগে ওই সংস্থাটি অধিগ্রহণ করে। এই ভলকাম্বি এসএ তাদের আন্তর্জাতিক ব্যবসার মেরুদণ্ড ছিল। অন্য ভর্তুকিপ্রাপ্ত সংস্থার নথি খতিয়ে দেখে আরও বিরাট অসামঞ্জস্য এবং গরমিল ধরা পড়ে। সেবি জানিয়েছে, সামগ্রিক আয়ের যে হিসেব তুলে ধরা হয়েছিল, তা সহযোগী সংস্থাগুলির যাচাইযোগ‍্য আয়ের তুলনায় অনেক বেশি ছিল। সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের আয়ের হিসেবে ১৫.১৫ লক্ষ কোটি টাকার সামগ্রিক গরমিল ধরা পড়ে। ওই সময়কালে যে সামগ্রিক আয়ের হিসেব প্রকাশ করে তা রাজেশ এক্সপোর্টস-এর প্রায় সমতুল্য। এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে, কর্পোরেট সেক্টরে আয়ের তথ্য বিকৃতি নিয়ে যত মামলা হয়েছে দেশের ইতিহাসে, তার মধ্যে এটি অন্যতম বৃহত্তম ঘটনা হিসেহে গণ্য হবে।

কিন্তু কেলেঙ্কারির পর্দাফাঁস করতে এত সময় কেন লাগল, তা নিয়ে জানা যাচ্ছে, তদন্ত লাগাতার বাধার মুখে পড়তে হয়। তদন্তকারীদের বহু নথি দিতে রাজেশ এক্সপোর্টস অস্বীকার করে। গ্রাহকের রেকর্ড, ভেন্ডারদের নথি, আর্থিক লেনদেনের তথ্য, কিছুই সম্পূর্ণ ভাবে তদন্তকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। তদন্তে সেভাবে সহযোগিতাও মেলেনি। ফলে অসম্পূর্ণ তথ্য নিয়েই কাজ শুরু করতে হয়।

এ ছাড়াও, আরও একটি চাঞ্চল্যকর তথ্য হাতে তদন্তকারীরা পেয়েছেন। জানা গিয়েছে, আফ্রিকার একটি স্বর্ণখনিতে এক হাজার ৩৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছিল রাজেশ এক্সপোর্টস। কিন্তু সেই বিনিয়োগের অস্তিত্ব প্রমাণ এবং মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় নথি দিতে ওই সংস্থা ব‍্যর্থ হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। সংস্থার আয়ব‍্যায়ের নথিতে সম্পদের পরিমাণ অতিরঞ্জিত করে দেখানো হলেও, তা প্রমাণের জন‍্য কোনও নথি তাদের কাছে ছিল না বলেই দাবি করা হয়েছে।

তদন্তকারীরা অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেডের নামে লেনদেন সংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখে। সেবির তথ‍্য বলছে, অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেডের সঙ্গে যথাক্রমে ১১ হাজার ৪৮৭ এবং ১১ হাজার ৪৮৮ কোটি টাকার ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত লেনদেন নথিবদ্ধ ছিল। কিন্তু অ্যাফ্লুয়েন্স শেয়ার অ্যান্ড স্টকস প্রাইভেট লিমিটেড ওই লেনদেনের কথা অস্বীকার করেছে। তারা জানায়, রাজেশ এক্সপোর্টস কোনও কালেই তাদের গ্রাহক ছিল না। কোনও চুক্তি হয়নি তাদের মধ্যে। আর তাতেই সিঁদুরে মেঘ দেখতে শুরু করেন তদন্তকারীরা।

রাজেশ এক্সপোর্টসে ভারতীয় জীবন বিমা সংস্থা এলআইসি-র ১০.৮ শতাংশ অংশীদারিত্ব রয়েছে। সেবির হিসেব অনুযায়ী, রাজেশ এক্সপোর্টস-এ মার্চ পর্যন্ত এলআইসির বিনিয়োগ ৩৩.৫৮ কোটি ছিল। রিটেল বিনিয়োগকারীদের অংশীদারিত্ব ১৪.৩ শতাংশ ছিল। বিনিয়োগ ছিল ৪৩৬ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত কানারা ব্যাঙ্কের প্রায় ৫০৯ কোটি টাকা রাজেশ এক্সপোর্টস-এর কাছ পাওনা রয়েছে।

সেবির নির্দেশ আসার পর রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারে পাঁচ শতাংশ পতন ঘটেছে। তবে বেশ কিছু বছর ধরেই টালমাটাল পরিস্থিতি চলছিল। গত তিন বছরে রাজেশ এক্সপোর্টস-এর শেয়ারের মূল্য ৮০ শতাংশের বেশি কমে গিয়েছে। ঋণের দায়ে রীতিমতো ধুঁকছিল। এখনও সেবির তরফে তদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট আসেনি। অভিযোগের জবাব দেওয়ারও সুযোগ পাবেন রাজেশ মেহতা এবং তাঁর সংস্থা রাজেশ এক্সপোর্টস।


Share