Nepal Flash Flood

চোখের সামনে পুরো ভবন গিলে খেল জল-কাদা-পাথরের স্রোত! গিরং সীমান্তে হড়পা বানের তাণ্ডব, তিন দিন পর পৌঁছোল ২১ জনের উদ্ধারকারী দল

বিপর্যয়ের তিন দিন পর দুর্গম পথ পেরিয়ে উদ্ধারকারী দল যখন সেখানে পৌঁছোয়, তখন অভিবাসন দফতরের অস্তিত্ব বোঝারও উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু কাদা, পাথর আর ধ্বংসস্তূপ।

নেপালে হড়পা বান।
নিজস্ব সংবাদদাতা, নেপাল
  • শেষ আপডেট: ২৯ আগস্ট ২০২৬ ০৫:৩২

পাহাড়, উপত্যকা আর জঙ্গল পেরিয়ে দুর্গম পথ অতিক্রম করে চীনের ২১ জনের উদ্ধারকারী দল অবশেষে নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরং এলাকায় পৌঁছোল। বিপর্যয়ের তিন দিন পর সেখানে পৌঁছে তাঁরা দেখলেন, যে অভিবাসন দফতর কয়েক দিন আগেও পর্যটকদের আনাগোনায় মুখর ছিল, সেটি এখন কার্যত নিশ্চিহ্ন। পড়ে রয়েছে শুধু কাদা-পাথরের স্তূপ।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তের গিরংয়ের ওই অভিবাসন দফতর দিয়েই পর্যটকেরা কৈলাস-মানস সরোবরের পথে যাত্রা করতেন। প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করানোর পরই মিলত এগিয়ে যাওয়ার অনুমতি। কয়েক দিন আগেও সাদারঙা ঝাঁ-চকচকে বহুতল সরকারি ভবনটি ছিল স্বাভাবিক অবস্থায়। কিন্তু হড়পা বানের ভয়াবহ জলস্রোত পুরো ভবনটিকেই গিলে নিয়েছে। বিপর্যয়ের তিন দিন পর দুর্গম পথ পেরিয়ে উদ্ধারকারী দল যখন সেখানে পৌঁছোয়, তখন অভিবাসন দফতরের অস্তিত্ব বোঝারও উপায় ছিল না। চারদিকে শুধু কাদা, পাথর আর ধ্বংসস্তূপ। এক ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয় কয়েক দিনের মধ্যেই বদলে দিয়েছে চেনা ছবিটা।

চীন থেকে আসা ২১ সদস্যের উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে একটি প্রশিক্ষিত কুকুরও রয়েছে। দলের এক সদস্য জানিয়েছেন, গিরঙে পৌঁছোনোর পথ মোটেই সহজ ছিল না। হড়পা বানে এলাকার অধিকাংশ রাস্তাঘাট নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। তাই ঘুরপথে পাহাড় ডিঙিয়ে, জঙ্গল ও নদী পেরিয়ে তাঁদের গিরঙে পৌঁছোতে হয়েছে। সেখানে পৌঁছে উদ্ধারকারীরা দেখেন, যে জায়গায় এক সময় একটি আস্ত বহুতল ছিল, সেখানে এখন শুধু ধ্বংসস্তূপ। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভোটেকোশী নদীর ভয়াল রূপও কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। তবে নদীর তীরে থাকা অভিবাসন দফতরের ভবনটিরও আর কোনও অস্তিত্ব নেই। পুরো এলাকা দেখে মনে হচ্ছে, যেন কোনও প্রবল শক্তি সব কিছু পিষে দিয়ে চলে গিয়েছে। উদ্ধারকারী দলের সদস্য জোউ মিঙ্কি বলেন, ‘‘অনেক দুর্গম পথ পেরিয়ে তবে গিরঙে পৌঁছোতে পেরেছি। কিন্তু সেখানে পৌঁছোতে যত দূর নজরে পড়েছে, শুধু ধ্বংসস্তূপের চিহ্ন।’’

তিব্বত ও নেপালের সংযোগস্থলে অবস্থিত গিরং সীমান্ত। কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার ক্ষেত্রে এই সীমান্তের অভিবাসন দফতরে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পরীক্ষা করার পর তীর্থযাত্রীদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এ ছাড়াও, খাসা ও কোরালায় চেকপয়েন্ট রয়েছে। তবে কৈলাসযাত্রার জন্য পর্যটক ও তীর্থযাত্রীরা গিরং সীমান্তের পথই বেশি ব্যবহার করেন। দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুধবার গিরং সীমান্তের অভিবাসন দফতরে যখন হড়পা বান আছড়ে পড়ে, তখন সেখানে প্রায় ১৩০ জন মানুষ ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ৫০ জনেরও বেশি ভারতীয় তীর্থযাত্রী ছিলেন বলে জানানো হয়েছে। তাঁরা ওই সীমান্ত দিয়ে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। বুধবার স্থানীয় সময় সকাল পৌনে ন'টা নাগাদ আচমকাই গিরংয়ের অভিবাসন দফতরের দিকে হড়পা বান ধেয়ে আসে। মুহূর্তের মধ্যে চার দিক থেকে প্রবল জলস্রোত, কাদা ও পাথর দফতরটিকে ঘিরে ফেলে। প্রায় চার-পাঁচতলা বাড়ির সমান বিশাল জলরাশি বহুতলটির উপর আছড়ে পড়ে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পুরো ভবন কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। হড়পা বানের সেই ভয়াবহ মুহূর্তের একাধিক ভিডিয়ো ইতিমধ্যেই প্রকাশ্যে এসেছে। সিসি ক্যামেরাতেও ঘটনার ছবি ধরা পড়েছে। পরে প্রকাশিত ভিডিয়োয় দেখা যায়, অভিবাসন দফতরের জায়গা দিয়ে শুধু কাদামিশ্রিত জলের প্রবল স্রোত বয়ে যাচ্ছে।

উল্লেখ্য, বুধবার সকালে নেপালের সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলার ভোটেকোশী নদীতে হিমবাহ ধসের জেরে ভয়াবহ হড়পা বান নামে। প্রবল জলের তোড়ে গ্রামের পর গ্রাম ভেসে যায়। বহু বাড়িঘর, রাস্তাঘাট ও সেতু ধ্বংস হয়। ভেসে যায় একাধিক গাড়িও। শনিবার সকাল পর্যন্ত নেপাল পুলিশের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এই ঘটনায় ৬১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এখনও নিখোঁজ তিন হাজারেরও বেশি মানুষ। নিখোঁজদের মধ্যে বেশ কয়েক জন ভারতীয়ও রয়েছেন।


Share