Nepal Flash Flood

নেপালে হড়পা বানে মৃতের সংখ্যা হাজার ছাড়াল, এখনও নিখোঁজ প্রায় চার হাজার! স্বজনের দেহ দেশে ফেরাতে ন’দফা প্রক্রিয়া জানাল ভারতীয় দূতাবাস

এই পরিস্থিতিতে নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস মৃতদেহ শনাক্তকরণ এবং স্বজনের দেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বিস্তারিত জানিয়েছে। এ বিষয়ে দূতাবাস মোট ন’টি ধাপ প্রকাশ করেছে।

পচে যাচ্ছে উদ্ধার হওয়া লাশ। নেপালে গণকবরের ব্যবস্থা করা হল।
নিজস্ব সংবাদদাতা, নেপাল
  • শেষ আপডেট: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫৭

২৬ অগস্টের ভয়াবহ হড়পা বানের পর থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত নেপালে এক হাজার তিন জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। সে দেশের জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) জানিয়েছে, এখনও প্রায় চার হাজার মানুষের কোনও সন্ধান মেলেনি। বিপর্যয়ের পর থেকে ১২ হাজার জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে নিখোঁজদের মধ্যে আর কোনও ভারতীয় রয়েছেন কি না, কিংবা কোনও ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই পরিস্থিতিতে নেপালের কাঠমান্ডুতে অবস্থিত ভারতীয় দূতাবাস মৃতদেহ শনাক্তকরণ এবং স্বজনের দেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া বিস্তারিত জানিয়েছে। এ বিষয়ে দূতাবাস মোট ন’টি ধাপ প্রকাশ করেছে।

নেপালের বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির বিপর্যস্ত আটটি জেলা থেকে নতুন করে বেশ কয়েকটি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এখনও পর্যন্ত এক হাজার ৫০ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। উদ্ধার হওয়া দেহগুলির মধ্যে চিতওয়ান থেকে ৩২১টি, নওয়ালপারাসি পূর্ব থেকে ২১৬টি এবং নওয়ালপারাসি পশ্চিম থেকে ১৭০টি দেহ উদ্ধার হয়েছে। এ ছাড়াও, নুয়াকোট থেকে ৯৫টি, গোর্খা থেকে ৬৫টি, ধড়িং থেকে ৫৭টি, রাসুয়া থেকে ৪১টি এবং তানাহুন থেকে ৩৮টি দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। অন্য দিকে, চিনের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের দাবি, তিব্বতে এই বিপর্যয়ে এখনও পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।

ভোটেকোশী নদীতে ভয়াবহ হড়পা বানের পর ছ’দিন পেরিয়ে গেলেও এখনও বহু মানুষের কোনও সন্ধান মেলেনি। বিপর্যস্ত এলাকায় উদ্ধারকারী দলের সঙ্গে নিখোঁজদের পরিজনেরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেও স্বজনদের কোনও খবর না মেলায় অনেকেই শেষ পর্যন্ত আশা ছেড়ে দিয়েছেন। মঙ্গলবার একাধিক নেপালি পরিবার নিখোঁজ আত্মীয়ের ফিরে আসার অপেক্ষা না করে ‘প্রতীকী দাহ’ করেন। কুশপুতুল তৈরি করে তাঁরা আচার মেনে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। পরিবারের সদস্যদের বিশ্বাস, এ ভাবেই প্রিয়জনের আত্মার শান্তি হবে।

নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, উষ্ণায়নের জেরে দেশে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি ক্রমশ বাড়ছে। গত সপ্তাহের হড়পা বানও সেই আশঙ্কারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে তিনি মনে করছেন। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপুঞ্জও সতর্ক করেছে। তাদের আশঙ্কা, ভবিষ্যতে হিমালয়ের বিভিন্ন এলাকায় হিমবাহ ভেঙে ফের এ ধরনের বিপর্যয় ঘটতে পারে। ২০২০ সালের একটি গবেষণাতেও সতর্ক করা হয়েছিল, নেপাল, চিন ও ভারতের ৪৭টি হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিজ্ঞানীদের সেই আশঙ্কাই ফের সামনে এল সাম্প্রতিক হড়পা বানের ঘটনায়।

মঙ্গলবার কাঠমান্ডুর ভারতীয় দূতাবাস একটি বিবৃতি প্রকাশ করে জানিয়েছে, নেপালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে মৃতদের দেহ শনাক্ত করা এবং শনাক্তকরণের পর তা ভারতে ফিরিয়ে আনার জন্য নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে নেপাল সরকারের নিয়ম মেনেই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। দূতাবাসের তরফে মোট ন’টি ধাপের কথা জানানো হয়েছে। সেগুলি হল মৃতদেহ নথিভুক্তকরণ, ছবি তুলে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ ও নথিভুক্ত করা, ময়নাতদন্ত, মৃত্যুর কারণ নির্ণয়, পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় নথি যাচাই, ডিএনএ পরীক্ষা, ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ, দূতাবাসের সহযোগিতায় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত এবং মেমো-সহ মৃতদেহ হস্তান্তর।

প্রাথমিক কয়েকটি ধাপ নেপালের প্রশাসনের তরফেই সম্পন্ন করা হবে। নেপাল পুলিশের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত মৃতদের ছবি দেখে কেউ যদি কোনও দেহকে নিজের স্বজনের বলে শনাক্ত করতে পারেন, তা হলে তাঁকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। অন্য দিকে, যে সব মৃতদেহ শনাক্ত করা সম্ভব হবে না, সেগুলির পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা করানো হবে।

নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের জন্য কাঠমান্ডু জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করছে। ইতিমধ্যেই ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক হিসাবও করা হয়েছে। নেপাল সরকারের অনুমান, বিধ্বস্ত পরিকাঠামো ও জনজীবন স্বাভাবিক করতে অন্তত ৫০০ কোটি ডলার, ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৪৭ হাজার ৫৮৪ কোটি টাকা প্রয়োজন। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে নেপাল আর্থিক সাহায্যের আবেদন জানিয়েছে। জলবায়ুজনিত বিপর্যয়ের ধাক্কা সামলাতে রাষ্ট্রপুঞ্জের বিশেষ তহবিল থেকে জরুরি ভিত্তিতে অর্থসাহায্য চাওয়া হয়েছে। নেপালের পরিবেশ মন্ত্রকের অধীন জলবায়ু পরিবর্তন বিভাগের প্রধান মহেশ্বর ধাকাল এই বিপর্যয়ের জন্য বিশ্বের ‘ধনী’ দেশগুলিকেই দায়ী করেছেন। তাঁর দাবি, গত সপ্তাহে নেপাল-তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে যে ভয়াবহ হড়পা বান নেমেছিল, তার অন্যতম কারণ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন।


Share