Grooming Gang

রচডেলে যৌন নির্যাতন মামলার আসামি সাবির আহমেদের জেলমুক্তি ঘিরে বিতর্ক ব্রিটেনে, দেশজুড়ে শুরু বিক্ষোভ, পাকিস্তানে নির্বাসনের দাবি

অতীতে পাকিস্তান একই ধরনের দোষীদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছিল। তার ওপর ব্রিটেনের অভিবাসন আইন থাকায় বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ফলে আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অপরাধমূলক অধ্যায়টি আবারও জনসমক্ষে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে।

অভিযুক্ত সাবির আহমেদ।
নিজস্ব সংবাদদাতা, দিল্লি
  • শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ১২:০৮

ব্রিটেনের অন্যতম কিশোরী যৌন নির্যাতন মামলার আসামি সাবির আহমেদের আগাম মুক্তিকে ঘিরে দেশজুড়ে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক বিতর্কও শুরু হয়েছে। ১৪ বছর কারাবাসের পরে ‘আগাম মুক্তি প্রকল্প’-এর আওতায় সাবিরকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। এর পর থেকেই আক্রান্তেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলে দাবি করা হয়েছে। বিক্ষোভকারীদের দাবি, এই অবস্থায় সাবিরকে পাকিস্তানে নির্বাসিত করা হোক।

অতীতে পাকিস্তান একই ধরনের দোষীদের ফিরিয়ে নিতে অস্বীকার করেছিল। তার ওপর ব্রিটেনের অভিবাসন আইন থাকায় বিষয়টি আরও জটিল আকার ধারণ করেছে। ফলে আধুনিক ব্রিটিশ ইতিহাসের অন্যতম অন্ধকার অপরাধমূলক অধ্যায়টি আবারও জনসমক্ষে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছে।

কে এই সাবির আহমেদ?

সাবির আহমেদের জন্ম হয়েছিল পাকিস্তানে। কয়েক দশক আগে সাবির ব্রিটেনে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। ২০১২ সালে ব্রিটিশ আদালত তাকে রচডেল শহরে সক্রিয় একটি নয় সদস্যের যৌন শোষণচক্রের প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করে। আদালত সাবিরকে কিশোরীদের ধর্ষণ ও গুরুতর যৌন অপরাধে মোট ৩০টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করে। আদালত সাবিরকে ২২ বছরের কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়।

বিচার চলাকালীন উঠে আসে, সাবির আহমেদ ও তার সাগরেদরা দরিদ্র ও সমস্যাগ্রস্ত পরিবারের কিশোরীদের নিশানা করত। খাবার, সিগারেট ও মদের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে তাদের আস্থা অর্জন করা হতো। পরে ওই কিশোরীদের দীর্ঘদিন ধরে যৌন ও মানসিক নির্যাতন করত। কার্যত তা করতে বাধ্য করা হত। তদন্ত চলাকালীন আক্রান্তেরা তদন্তকারীদের জানান, তারা এতটাই ভীত ছিল যে, সাবির আহমেদকে “ড্যাডি (বাবা)” বলে সম্বোধন করতে বাধ্য করা হতো। এই মামলা ব্রিটেনের পুলিশি ব্যবস্থা ও শিশু সুরক্ষায় ব্যর্থতা প্রকাশ্যে এনে দেয়।

মুক্তির পরে আতঙ্কে ভুক্তভোগীরা

১৪ বছর কারাবাসের পর আগাম মুক্তির আওতায় সাবির আহমেদ সম্প্রতি জেল থেকে মুক্তি পেয়েছে। যদিও সাবির কারাগারের বাইরে থাকলেও প্রশাসন তার ওপর কড়া নজরদারি চালাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। তার পায়ে জিপিএস-সংযুক্ত ইলেকট্রনিক ট্যাগ পরানো হয়েছে। যার মাধ্যমে সাবিরের গতিবিধি ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি তাকে রচডেল ও পার্শ্ববর্তী ওল্ডহ্যাম এলাকায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। আক্রান্তদের সংস্পর্শে যাতে সাবির না আসতে পারে সেই জন্যই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

তবুও সাবির আহমেদের জেলমুক্তির ঘটনায় নির্যাতনের শিকার হওয়া কিশোরীরা আতঙ্কিত রয়েছেন। এক ভুক্তভোগী সংবাদমাধ্যমকে জানান, তিনি শুধু নিজের নয়, নিজের সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বিগ্ন। তাঁর কথায়, সাবির আহমেদের মুক্তির খবর পুরনো মানসিক ক্ষতকে আবারও উসকে দিয়েছে। অনেক ভুক্তভোগী বাড়ির বাইরে বেরোতেও ভয় পাচ্ছেন।

স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। রচডেলে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে কিছু বাসিন্দা রাতে এলাকায় টহল শুরু করেছেন। অনেকের মতে, এত গুরুতর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত একজন ব্যক্তির সমাজে মুক্তভাবে বসবাস করা উচিত নয়।

১৯৭১ সালের অভিবাসন আইনের জটিলতা

দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর সরকার সাবির আহমেদের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল করে দিয়েছে। ফলে আইন অনুযায়ী সাবির বর্তমানে পাকিস্তানের নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হবে। যদিও সাবিরকে পাকিস্তানে পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ যুক্তরাজ্যের ১৯৭১ সালের অভিবাসন আইন একটি ধারা সাবিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

এই আইনে বলা হয়েছে, ১৯৭৩ সালের আগে কমনওয়েলথভুক্ত কোনও দেশ থেকে বৈধভাবে ব্রিটেনে এসে অন্তত পাঁচ বছর বসবাসকারী অনেক ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে নির্বাসন থেকে সুরক্ষা দেওয়া হয়।

সাবির আহমেদ ১৯৬০-এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান থেকে ব্রিটেনে এসেছে জুড়ে বসেছিল। সে সময় পাকিস্তান কমনওয়েলথের সদস্য ছিল। ফলে সে ওই আইনি সুরক্ষার আওতায় পড়ে গিয়েছে। এই কারণেই সাবিরের মতো অন‍্য গুরুতর অপরাধীদের ক্ষেত্রেও নির্বাসিত করা আইনগত ভাবে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্রিটেনের কাছে। এই পরিস্থিতি ঘিরে বহু মহল থেকে সমালোচনা শুরু হয়েছে। সমালোচকদের দাবি, এত পুরনো আইন কখনও এমন গুরুতর অপরাধীদের সুরক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়নি।

পাকিস্তানের সহযোগিতা নিয়েও অনিশ্চয়তা

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপও বেড়েছে। বহু শীর্ষ নেতা বলেছেন, পুরনো অভিবাসন আইন কোনোভাবেই বিপজ্জনক অপরাধীদের রক্ষা করার ঢাল হতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রককে সাবির আহমেদের মামলাটি পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন। তাকে নির্বাসনের সম্ভাব্য আইনি পথ খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে গুরুতর অপরাধে দোষী ব্যক্তিদের নির্বাসন সহজ করার জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নতুন অভিবাসন বিল নিয়ে আলোচনা চলছে বলে দ‍্য গার্ডিয়ান দাবি করেছে। সাবির আহমেদকে নির্বাসিত করতে হলে পাকিস্তান সরকারের সহযোগিতা পাওয়াটাও ব্রিটেনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেও ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

ব্রিটিশ সরকার ইতিমধ্যে পাকিস্তানের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। কিন্তু অতীতেও পাকিস্তান একই ধরনের কয়েক জন দোষীকে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল। রচডেল চক্রের আরও দুই সদস্যের ব্রিটিশ নাগরিকত্ব বাতিল হলেও পাকিস্তান তাদের দেশে প্রবেশের অনুমতি দেয়নি। এই অবস্থায় ব্রিটেনের কিছু রাজনীতিবিদদের মতে, পাকিস্তান যদি সাবির আহমেদকেও গ্রহণ না করে, তাহলে পাকিস্তানকে দেওয়া ব্রিটিশ বৈদেশিক সহায়তা কমানোর বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত।

বর্তমানে সাবির আহমেদ ব্রিটিশ পুলিশের নজরদারির মধ্যে রয়েছে। তাকে পাকিস্তানে নির্বাসিত করা সম্ভব হবে কি না, তা এখন দু’দেশের আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করছে। এই ঘটনা আবারও ব্রিটেনে জননিরাপত্তা, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার, অভিবাসন আইন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে।


Share