France Riot

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও জনপরিষেবার বেহাল দশা ঘিরে ফ্রান্সজুড়ে আগুন! হিংসাত্মক বিক্ষোভে ২ হাজার ৪০০ গ্রেফতার, হাজার হাজার দোকানে ভাঙচুর-লুটপাট

বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে সরকারি ভবন, বিপণি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও। হিংসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে চাপে পড়েছে ফরাসি সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের কৌশল বদল থেকে শুরু করে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ।

জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও জনপরিষেবার বেহাল দশা ঘিরে ফ্রান্সজুড়ে অশান্তি।
নিজস্ব সংবাদদাতা, ফ্রান্স
  • শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১২:৪৬

জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, স্কুল-সহ বিভিন্ন জনপরিষেবার বেহাল অবস্থা— একাধিক ইস্যুতে ফ্রান্সজুড়ে চলা বিক্ষোভ সপ্তাহান্তে ভয়াবহ হিংসার চেহারা নেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্যারিস-সহ একাধিক শহরে প্রশাসন আংশিক কার্ফু ও জমায়েতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। বিক্ষোভের আঁচ ছড়িয়ে পড়েছে সরকারি ভবন, বিপণি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানেও। হিংসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার অভিযোগে চাপে পড়েছে ফরাসি সরকার। পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশের কৌশল বদল থেকে শুরু করে নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাকরঁ।

প্যারিসজুড়ে সম্পূর্ণ কার্ফু জারির পরিবর্তে পরিস্থিতি অনুযায়ী এলাকাভিত্তিক বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে সওয়াল করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান লেকর্নু। তাঁর নির্দেশে সোমবার রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত রাজধানীর ‘প্লাস দে লা রিপ্যুবলিক’ এবং ‘লে আল’ শপিং এলাকায় কার্ফু জারি করে পুলিশ। এ ছাড়া, মানুষের নিরাপত্তা এবং সরকারি ও ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষায় রাত ৮টার পর থেকে প্যারিসে সব ধরনের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। উত্তর ফ্রান্সের লিল শহরেও রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত কার্ফু জারি রয়েছে। নিস শহরে অপ্রাপ্তবয়স্কদের জন্য রাতের বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। সোমবার নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মার্সেই শহরেও বিক্ষোভ ও জমায়েত নিষিদ্ধ করে প্রশাসন।

সংবাদসংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সপ্তাহান্তে প্যারিস, লিয়ঁ, মার্সেই-সহ একাধিক শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। ‘ফেডারেশন অফ ট্রেড অ্যান্ড রিটেল’-এর দাবি, ভাঙচুর ও লুটপাটের জেরে প্রায় ৩ হাজার দোকান এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তালিকায় রয়েছে প্যারিসের একাধিক বিলাসবহুল বুটিক এবং মার্সেইয়ের ফুটবল ক্লাব ‘অলিম্পিক দে মার্সেই’-এর সরকারি বিপণিও। বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে সরকারি সম্পত্তিতেও। মধ্য ফ্রান্সের লিমোজ় শহরে উনিশ শতকে নির্মিত ঐতিহাসিক পুরভবনে আগুন ধরিয়ে দেন বিক্ষোভকারীরা। সেই আগুনে ছাদ ধসে পড়ে। কার্যত ধ্বংসের মুখে ঐতিহাসিক ভবনটি।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ়। কিন্তু তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট মাকরঁ। বরং গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং আগাম পরিকল্পনায় কোথায় ত্রুটি ছিল, তা খতিয়ে দেখে স্বচ্ছতা বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। ভবিষ্যতে এই ধরনের হিংসা এড়াতে পুলিশের রণকৌশলে দ্রুত পরিবর্তন আনার কথাও বলেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট।

বিক্ষোভের পিছনে অতি-বামপন্থী সংগঠন এবং সুযোগসন্ধানী লুটেরাদের দায়ী করেছেন প্রধানমন্ত্রী লেকর্নু ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজ়। তাঁদের অভিযোগ, আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে দেশে অস্থিরতা তৈরি করাই অতি-বামপন্থীদের উদ্দেশ্য। অন্য দিকে, কট্টর দক্ষিণপন্থী দল ‘ন্যাশনাল র‌্যালি’-র প্রেসিডেন্ট জর্ডন বার্ডেলার দাবি, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে সরকার। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে মাকরঁ প্রশাসনের উপর।

প্রশাসনের কড়া পদক্ষেপেও অবশ্য থামেনি বিক্ষোভ। সোমবার প্যারিসের বিশ্বখ্যাত ল্যুভর মিউজ়িয়ামের প্রবেশপথ অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখান ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা। এর জেরে নির্ধারিত সময়ে মিউজ়িয়াম খোলা সম্ভব হয়নি। আগামী ৫ নভেম্বর দেশজুড়ে নতুন করে ধর্মঘট ও পদযাত্রার ডাক দিয়েছে ফরাসি শ্রমিক সংগঠনগুলি। পাশাপাশি, ২০১৮ সালের বহুল আলোচিত ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনকে ফের চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিচ্ছেন আন্দোলনকারীরা।

২০১৮ সালের নভেম্বরে জ্বালানির উপর কর বৃদ্ধি, লাগামছাড়া জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রতিবাদে ফ্রান্সে শুরু হয়েছিল ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলন। ফরাসি ট্র্যাফিক আইন অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়িতে বাধ্যতামূলকভাবে হলুদ রঙের রিফ্লেক্টিভ জ্যাকেট বা ভেস্ট রাখতে হয়। সেই ভেস্ট পরেই রাস্তায় নেমেছিলেন সাধারণ মানুষ। সেখান থেকেই আন্দোলনের নাম হয় ‘ইয়েলো ভেস্ট’। তৎকালীন সময়ে মাকরঁ সরকারের আর্থিক নীতির বিরুদ্ধে যে ব্যাপক জনরোষ তৈরি হয়েছিল, বর্তমান বিক্ষোভে সেই স্মৃতিকেই ফের উস্কে দিতে চাইছেন আন্দোলনকারীরা।

ফলে ফরাসি প্রশাসনের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধি ও জনপরিষেবার অবনতির মতো সমস্যায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের অসন্তোষের কারণ খুঁজে বের করা। অন্য দিকে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের থেকে হিংসায় জড়িত এবং লুটপাট চালানো ব্যক্তিদের পৃথক করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা। বিপুল সরকারি ঋণ ও আর্থিক চাপের মধ্যে ধারাবাহিক এই বিক্ষোভ ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে মাকরঁ সরকারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার, প্রশাসন কত দ্রুত স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে পারে এবং জনরোষ প্রশমনে কার্যকর পদক্ষেপ করতে সক্ষম হয়।


Share