Bikash Bhawan

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতিতে বড় রদবদল! ১৪ প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে শুধু প্রশাসনিক আধিকারিক, আপত্তি কমিউনিস্ট শিক্ষকদের একাংশের

ফলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কমিটিতে সরকার মনোনীত প্রতিনিধিদের পদ দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। বিশেষ করে সরকারি প্রতিনিধি না থাকায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতির বৈঠকও আটকে ছিল। নতুন প্রতিনিধিদের নিয়োগের ফলে সেই অচলাবস্থা কাটার আশা করা হচ্ছে।

বিকাশ ভবন।
নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা
  • শেষ আপডেট: ৩১ জুলাই ২০২৬ ১১:৫০

লম্বা অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে রাজ্যের ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতিতে উচ্চশিক্ষা দফতরের নতুন সরকারি প্রতিনিধিদের নাম ঘোষণা করল বিকাশ ভবন। প্রকাশিত তালিকায় দেখা গিয়েছে, সরকার মনোনীত সকল প্রতিনিধিই আইএএস বা ডব্লিউবিসিএস পদমর্যাদার প্রশাসনিক আধিকারিক। এ বার কোনও শিক্ষাবিদ বা অধ্যাপককে এই দায়িত্বে রাখা হয়নি।

বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিজ্ঞপ্তি জারি করে আগের সরকারের মনোনীত প্রতিনিধিদের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর অনুরোধ জানানো হয়েছিল। এরপর পর্যায়ক্রমে তাঁরা পদত্যাগ করেন। ফলে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কমিটিতে সরকার মনোনীত প্রতিনিধিদের পদ দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। বিশেষ করে সরকারি প্রতিনিধি না থাকায় একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতির বৈঠকও আটকে ছিল। নতুন প্রতিনিধিদের নিয়োগের ফলে সেই অচলাবস্থা কাটার আশা করা হচ্ছে।

শুক্রবার উচ্চশিক্ষা দফতর ১৪টি রাজ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতির জন্য সরকার মনোনীত প্রতিনিধিদের তালিকা প্রকাশ করেছে। তবে এই তালিকায় রাজ্যের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নেই। উল্লেখযোগ্য ভাবে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এখনও কোনও সরকারি প্রতিনিধির নাম ঘোষণা করা হয়নি। যে ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রতিনিধি মনোনীত করা হয়েছে, সেগুলি হল- যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়, মৌলানা আবুল কালাম আজাদ প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়, কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয়, গৌড়বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়, পশ্চিমবঙ্গ রাষ্ট্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় (বারাসত), বাবা সাহেব আম্বেডকর এডুকেশন বিশ্ববিদ্যালয়, কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়, বাঁকুড়া বিশ্ববিদ্যালয়, রানি রাসমণি গ্রিন ইউনিভার্সিটি, হিন্দি বিশ্ববিদ্যালয়, সিধো-কানহো-বীরসা বিশ্ববিদ্যালয় এবং দার্জিলিং হিলস ইউনিভার্সিটি।

দার্জিলিং হিলস বিশ্ববিদ্যালয়, কন্যাশ্রী বিশ্ববিদ্যালয় এবং কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতির সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে উচ্চশিক্ষা দফতরের যুগ্ম সচিব অরিন্দম বিশ্বাসকে মনোনীত করা হয়েছে। অন্য দিকে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাবা সাহেব আম্বেডকর এডুকেশন বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে যুগ্ম সচিব আজার জিয়াকে। অর্থাৎ, একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই আধিকারিককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে বাকি কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে পৃথক পৃথক আধিকারিকদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।

এই তালিকা প্রকাশের পর থেকেই শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও একাডেমিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় শিক্ষকদের প্রতিনিধিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। এত দিন সরকারি প্রতিনিধি হিসেবে শিক্ষাবিদ বা অধ্যাপকদেরও রাখা হতো। বাম জমানার মার্কামারা কমিউনিস্ট শিক্ষকেরা কর্মসমিতিতে থাকতেন। তৃণমূল জমানায় মন্ত্রী হন ব্রাত‍্য বসু। তিনি নিজেও কমিউনিস্ট। পরিবর্তন হওয়ার বদলে কমিউনিস্ট শিক্ষকদের প্রভাবই বাড়তে থাকে। কিন্তু এ বারের তালিকা মন মতো না হওয়ায় সরব হয়েছে তাঁদেরই একটা অংশ।

কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুটার সাধারণ সম্পাদক নিলয়কুমার সাহা এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, “শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষাবিদদেরই প্রাধান্য থাকা উচিত। একজন প্রশাসক এবং একজন শিক্ষাবিদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ আলাদা। স্বাধীনোত্তর ভারতে সর্বপল্লি রাধাকৃষ্ণণ, সি. ভি. রমন, আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো শিক্ষাবিদরাই বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে দায়িত্ব সামলেছেন।”

অন্য দিকে, অখিল ভারতীয় রাষ্ট্রীয় শৈক্ষিক মহাসঙ্ঘের (উচ্চশিক্ষা) রাজ্য সাধারণ সম্পাদক প্রশান্ত সরকার সরকারের সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর বক্তব্য, “প্রশাসনিক ও শিক্ষাগত দুই ক্ষেত্রেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি পিছিয়ে পড়েছে। সেই পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতেই আপাতত এই আধিকারিকদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্র ও রাজ্য যাতে সমন্বয় রেখে কাজ করতে পারে এবং জাতীয় শিক্ষানীতি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটাই এই পদক্ষেপের মূল উদ্দেশ্য। পাশাপাশি রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন গড়ে তোলাও সরকারের লক্ষ্য।” তিনি আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাই শিক্ষাব্যবস্থার মূল দায়িত্বে থাকবেন। বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতেই আপাতত প্রশাসনিক আধিকারিকদের মনোনীত করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসমিতিতে প্রশাসনিক আধিকারিকদের অন্তর্ভুক্তি নিয়ে অবশ্য আপত্তির কোনও কারণ দেখছেন না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। তাঁর বক্তব্য, কর্মসমিতির সদস্য হিসেবে উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক আধিকারিকদের থাকা অস্বাভাবিক নয়। অতীতেও একাধিক আইএএস আধিকারিক সরকার মনোনীত প্রতিনিধি হিসেবে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

শুক্রবার জারি হওয়া নির্দেশিকায় সরকার মনোনীত প্রতিনিধিদের জন্য একাধিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত বিশ্ববিদ্যালয়গুলির কোর্ট ও কর্মসমিতির বৈঠকে যোগ দেওয়ার আগে প্রতিনিধিদের অবশ্যই উচ্চশিক্ষা দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিব এবং উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। পাশাপাশি, বৈঠকে কোন কোন বিষয় নিয়ে আলোচনা হবে, সে সম্পর্কেও সরকারকে অবহিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্দেশিকায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বৈঠক শেষ হওয়ার পর কার্যবিবরণী প্রকাশের জন্য অপেক্ষা করা যাবে না। আলোচিত বিষয়গুলির সংক্ষিপ্ত বিবরণ অবিলম্বে উচ্চশিক্ষা দফতরের অতিরিক্ত মুখ্যসচিবের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষামন্ত্রীর কাছে পাঠাতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলির জন্য প্রতিনিধি ঘোষণার তালিকায় শুক্রবার কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম না থাকায় নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, শতাব্দীপ্রাচীন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান কী। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসমিতির বৈঠক না হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজ আটকে রয়েছে বলে অভিযোগ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংগঠন কুটা-র সাধারণ সম্পাদক সাগরময় ঘোষ বলেন, “সরকারি প্রতিনিধি না থাকায় সিন্ডিকেটের বৈঠক করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক কাজ দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে রয়েছে। আমরা চাই, সরকার দ্রুত প্রতিনিধি নিয়োগ করে এই অচলাবস্থার অবসান ঘটাক।”


Share