Deepawali celebrated by Hindu across the globe.

দীপাবলীর সাতকাহন, কার্তিক অমাবস্যার দীপালোক অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক

স্কন্দপুরাণের একটি কাহিনী এইরকম -- একসময় দেবী পার্বতীর সঙ্গে ঝগড়া করে রেগে গিয়ে শিব অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। শিব অদৃশ্য হতে তাঁর তিন নেত্র, যার একটিতে সূর্য, একটিতে চন্দ্র এবং তৃতীয়টিতে অগ্নির অধিষ্ঠান – তারাও অদৃশ্য হল। জগতে অন্ধকার নেমে এলো। দেবতা, মানুষ সকলে ত্রস্ত হয়ে উঠল। তখন ভগবান বিষ্ণু বললেন – আপনারা শত শত প্রদীপ জ্বালান। তাতেই জগতের অন্ধকার দূরে যাবে, শিবও তুষ্ট হবেন।

প্রতীকী চিত্র।
সুচেতা বন্দ্যোপাধ্যায়
  • শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৫ ০১:৫৪

দীপাবলী পালনের কোনও একটা কারণ হয় না, একে উৎসবের একটা সম্পূর্ণ ‘প্যাকেজ’ বলা চলে। দীপাবলীর মূল সুর বাঁধা রয়েছে অগ্নিদেবতার আরাধনায়, জ্ঞানের, চেতনার উদ্‌যাপনে। 

সেই কত লক্ষ বছর আগে আদিম মানুষ আগুনের ব্যবহার শিখেছিল, আগুন জ্বালাতে, আগুনের শিখাকে নিয়ন্ত্রণ করতে শিখেছিল – মানব সভ্যতার সেই প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারের প্রতি, পৃথিবীর প্রাণীজগতে নিয়ন্ত্রক শক্তি হয়ে ওঠার সেই প্রথম ধাপের প্রতি মানুষের উচ্ছ্বাস সেই আদিমকাল থেকেই রয়ে গিয়েছে, ফলে পৃথিবীর প্রায় সমস্ত প্রাচীন সভ্যতায় অগ্নি একজন গুরুত্বপূর্ণ দেবতা এবং তাঁকে কেন্দ্র করে আলোর উৎসব পালনের প্রথাও সারা পৃথিবীতেই অতিপ্রাচীন। 

আমাদের ভারতীয় বৈদিক সভ্যতায় তার প্রথম প্রকাশ দেখা যায় যজ্ঞের আয়োজনে এবং অগ্নির উদ্দেশে উচ্চারিত বেদমন্ত্রে, যেখানে অগ্নিকেই বার বার সৃষ্টির কারণস্বরূপ, সম্পদের উৎস এবং সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি বলা হয়েছে। সকল বৈদিক দেবতার তিনি প্রতিনিধি, তিনি দেবতাদের মুখ, হবিবহনকারী হব্যবাহন। পরবর্তীকালে বৈদিক যাগযজ্ঞের প্রভাব কমে এলে ঘৃতপূর তৈলপূর প্রদীপশিখাই যেহেতু সূর্যাস্তের পরেও কর্মব্যস্ততা সচল রাখতে সহায়, সেহেতু যজ্ঞাগ্নির পরিবর্তে প্রদীপশিখায় অগ্নির উপাসনার প্রাধান্য বেড়েছে আর সেই সঙ্গে বেড়েছে দীপাবলী উপলক্ষে দেবপূজার প্রচলন।

পুরাণে আলোর উৎসব দীপাবলী সম্পর্কে একাধিক গল্প আছে। স্কন্দপুরাণের একটি কাহিনী এইরকম -- একসময় দেবী পার্বতীর সঙ্গে ঝগড়া করে রেগে গিয়ে শিব অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিলেন। শিব অদৃশ্য হতে তাঁর তিন নেত্র, যার একটিতে সূর্য, একটিতে চন্দ্র এবং তৃতীয়টিতে অগ্নির অধিষ্ঠান – তারাও অদৃশ্য হল। জগতে অন্ধকার নেমে এলো। দেবতা, মানুষ সকলে ত্রস্ত হয়ে উঠল। তখন ভগবান বিষ্ণু বললেন – আপনারা শত শত প্রদীপ জ্বালান। তাতেই জগতের অন্ধকার দূরে যাবে, শিবও তুষ্ট হবেন। 

দেবতারা অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলেন – প্রদীপ জ্বালানোর আগুন পাব কোথায়? নারায়ণ সেই হৃদয়োস্থিত চেতনার অগ্নির কথা স্মরণ করালেন সকলকে – সেই চেতনার অগ্নিতেই দীপ জ্বলে উঠল শত শত, অজ্ঞানের অন্ধকার চেতনার আগুনে ধুয়ে দিয়ে দেব-মানব সকলে ভগবান শিবের উদ্দেশে দীপ নিবেদন করলেন, যেন প্রার্থনা করলেন – তমসো মা জ্যোতির্গময়। শিব প্রসন্ন হয়ে দর্শন দিলেন আবার, জগত আলোকিত হয়ে উঠল।

এই কাহিনীই একটু অন্যরকম করে বলা হয়েছে ওই একই পুরাণের অন্য অধ্যায়ে। সেখানে দেখা যাচ্ছে ভগবান বিষ্ণুর কৃপায় আমাদের দেশের পার্বত্য নাগ জনজাতির মানুষজনই নাকি প্রথম দীপের আলোকে অন্ধকার দূর করতে শিখেছিল। তারপর দেবতারা, এবং অন্য মানুষজন তা শিখলেন। অসুররাও শিখল, তাতে তাদের পাতাললোক আলোকিত হয়ে উঠল। অন্ধকার রয়ে গেল শুধু মৃত্যুর অধিপতি যমরাজের অধীনস্থ প্রেতলোকে। তাই সেই যমলোক আলোকিত করে পিতৃপুরুষদের কাছে চৈতন্যময়ী আলোকজ্যোতি পৌঁছে দেবার জন্যই গোটা কার্তিকমাস জুড়ে যমদীপ এবং আকাশপ্রদীপের ব্যবস্থা। 

কী জানি, বৈদিক আর্যসভ্যতা আমাদের দেশের আদি অধিবাসী নাগ জনজাতির কাছ থেকেই দীপাবলী পালন শিখেছিল কিনা। দীপাবলীর উল্লেখ না থাকলেও কার্তিকমাস জুড়ে ব্রতপালনের প্রাচীন উল্লেখ কিন্তু মহাভারতে পাওয়া যাচ্ছে, ধর্মপ্রাণ রাজারা শরতকালে কার্তিকমাসে মদ্য-মাংস বর্জন করতেন, উপবাসব্রত করতেন পিতৃপুরুষের এবং পরমেশ্বরের সন্তোষের জন্য, সমৃদ্ধির কামনায়।   

তবে দীপাবলীতে এখনকার সবথেকে জনপ্রিয় আয়োজন শ্রীলক্ষ্মীর আরাধনা। প্রচলিত বিশ্বাস, সমুদ্রমন্থনের পরে এই তিথিতেই দেবী লক্ষ্মী উঠে এসেছিলেন ক্ষীরোদসাগর থেকে। যদিও মহাকাব্যে বা প্রাচীন কোনও পুরাণে সমুদ্রমন্থনের তিথি পাওয়া যায় না, তবু স্কন্দপুরাণের মতো খানিক অল্পবয়সী পুরাণ দীপাবলীতে লক্ষ্মী আরাধনার প্রথা মাথায় রেখেই অমৃতমন্থনের কথা স্পষ্ট ভাবে না বলেও একটু সূত্র দিয়ে রেখেছে। 

স্কন্দপুরাণ এবং পদ্মপুরাণ জানিয়েছে – একসময় দেবতারা শ্রীসম্পদ সব হারিয়েছিলেন কোনও কারণে এবং তাঁরা যখন জানতে পারলেন যে, সম্পদের দেবী লক্ষ্মী ক্ষীরোদসাগরের গর্ভে ঘুমিয়ে আছেন, তখন তাঁরা সাগরতীরে গিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দেবীর আবাহন করেন এবং তাতে প্রসন্ন হয়ে কার্তিকের অমাবস্যার দিনেই দেবী লক্ষ্মী সমুদ্রতল থেকে উঠে এসেছিলেন। শ্রীহীন দেবতাদের দুঃখ দূর হল দেবীর আবির্ভাবে এবং তাঁরাই প্রথম এই তিথিতে অলক্ষ্মী বিদায় করে লক্ষ্মী আরাধনা আরম্ভ করলেন। পরে তা প্রচলিত হল মর্ত্যলোকেও। 

স্কন্দপুরাণ লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন কীভাবে করতে হবে তারও একটু বিবরণ দিয়েছে। দেবীর প্রতিমা, ঘট স্থাপন করে, তাঁকে পদ্মের আসনে বসিয়ে পুজো করে নিবেদন করতে হবে লাড্ডু, তবে এই লাড্ডু কিন্তু মোতিচুরের লাড্ডু নয়, বরং বাঙালির কড়াপাক ক্ষীরের মিষ্টির কাছাকাছি – গোরুর দুধে পরিমাণমতো শর্করা, এলাচ, জায়ফল, লবঙ্গ, কর্পূর দিয়ে সেই দুধ জ্বাল দিয়ে সেই ক্ষীর দিয়ে লাড্ডু তৈরী করতে হবে দীপাবলীর দিন এবং অন্যান্য চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়র সঙ্গে এই লাড্ডু দেবীকে নিবেদন করতে হবে এবং এই বিধিমতে পুজো করলেই দেবীর কৃপায় লাভ হবে অক্ষয় সম্পদ –

তস্মাৎ সর্বপ্রযত্নেন লক্ষ্মীং সম্পূজয়েন্নরঃ।

স তু দারিদ্র্যনির্মুক্তঃ স্বজাতৌ স্যাৎ প্রতিষ্ঠিতঃ।।

জাতিপত্রলবঙ্গৈলাত্বক্কর্পূর সমন্বিতম্‌।

পাচয়িত্বা গব্যদুগ্ধম্‌ সিতাং দত্ত্বা যথোচিতাম্‌।।

লড্ডুকাংস্তস্য কুর্বীত তাংশ্চ লক্ষ্মৈ সমর্পয়েৎ।

অন্যচতুর্বিধং ভক্ষ্যং দদ্যাচ্ছ্রীঃ প্রীয়তামিতি।।

ভবিষ্যপুরাণ কোথায় কোথায় দীপ জ্বালাতে হবে তার একটা তালিকা দিয়েছে যা পড়ে বোঝা যায় দীপাবলীর দিনে জনপদে যেন কোনও অন্ধকার স্থান না থাকে, এমনটাই পৌরাণিক বিধান – গাছের তলায়, গোয়াল ঘরে, গোচারণের মাঠে, শ্মশানে, নদীতীরে, পর্বতের পাদদেশে, মন্দিরে, চার রাস্তার মোড়ে, ঘরে, উঠোনে সর্বত্র শত শত প্রদীপ জ্বালিয়ে রাতের অন্ধকার মুছে দেবার বিধান আছে এই পুরাণে।

দীপাবলী পালনের ক্ষেত্রে উত্তর ভারতের বিশেষ করে উত্তরপ্রদেশের মানুষের প্রচলিত বিশ্বাস, এইদিনে তাঁদের ঘরের ছেলে রামলালা বনবাস শেষ করে ফিরে এসেছিলেন অযোধ্যায়। আর সেই জন্যই তাঁকে স্বাগত জানাতে আযোধ্যার প্রজারা লক্ষ লক্ষ দীপের আলোতে নগর সাজিয়ে তুলেছিল। এই লোকভাবনার বয়সও বেশ কয়েকশ বছর তো হবেই। তবে বাল্মীকি-রামায়ণে যেমনটি পাই – রাজা দশরথ শ্রীরামচন্দ্রকে যুবরাজ পদে অভিষিক্ত করবেন স্থির করেছিলেন চৈত্র মাসে –

চৈত্রঃ শ্রীমানয়ং মাসঃ পুণ্যঃ পুষ্পিতকাননঃ।

যৌবরাজ্যয়ায় রামস্য সর্বমেবোপকল্প্যতাম্‌।।

সেই রাজ্যাভিষেক শেষ পর্যন্ত হয়নি এবং পরের দিনই শ্রীরামকে বনবাসে যেতে হয়। ঠিক তার চোদ্দ বছর পরে ‘পূর্ণে চতুর্দশে বর্ষে’ আবার এক চৈত্রমাসেই শ্রীরামচন্দ্র ফিরে এসেছিলেন অযোধ্যায়, শুক্লপক্ষের ষষ্ঠীতিথিতে যাকে এখন আমরা অশোকষষ্ঠী বলে থাকি। কাজেই কার্তিকমাসের দীপাবলীর সঙ্গে শ্রীরামচন্দ্রের আযোধ্যায় ফেরার কোনও পৌরাণিক সম্পর্ক নেই। তবে গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা সেই কোন মহাভারতের কালে দীপাবলীর দিনেই ঘটেছিল আর সেই কারণে যদি সারা ভারতে আলোকসজ্জা এবং সম্পদের আরাধনা শুরু হয়ে থাকে তাহলেই বরং মানায় বেশি। 

মহাভারতের সভাপর্ব জানিয়েছে – শ্রীকৃষ্ণ অর্জুন এবং ভীমকে সঙ্গে নিয়ে জরাসন্ধকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে মগধে প্রবেশ করার পর কার্তিকমাসের প্রথম দিনে অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষের সূচনায় ভীমের সঙ্গে জরাসন্ধের মল্লযুদ্ধ আরম্ভ হয়, দীর্ঘ তেরোদিন অক্লান্তভাবে যুদ্ধ করার পর চতুর্দশীর দিন রাত্রে জরাসন্ধ ক্লান্ত হয়ে পরেন এবং তা দেখে ভীম কৃষ্ণের পরামর্শমতো মরণ প্রহার আরম্ভ করেন এবং অবশেষে অমাবস্যার দিনে জরাসন্ধ নিহত হন –

কার্তিকস্য তু মাসস্য প্রবৃত্তং প্রথমে’হনি।

অনাহারং দিবারাত্রম্‌ অবিশ্রান্তম্‌ অবর্তত।।

তদ্‌বৃত্তন্তু ত্রয়োদশ্যাং সমবেতং মহাত্মনো।

চতুর্দশ্যাং নিশায়ান্তু নিবৃত্তো মাগধঃ ক্লমাৎ।।

 সম্রাট জরাসন্ধের একচ্ছত্র শাসন থেকে সেদিন গোটা আর্যাবর্ত মুক্তি পেয়েছিল, মুক্তি পেয়েছিলেন তাঁর কারাগারে বন্দি চুরানব্বইজন রাজা, যাদের মহাদেবের উদ্দেশে বলি দিয়ে জরাসন্ধ নিজের একচ্ছত্র আধিপত্য অক্ষয় করে তুলতে চেয়েছিলেন। কাজেই জরাসন্ধের মৃত্যুতে আর্যাবর্তের সকল রাজা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শ্রীসম্পদের উৎসব পালন করবেন এটাই স্বাভাবিক। কার্তিক অমাবস্যার দীপালোক এই কাহিনী অনুসারে অশুভ শক্তির বিনাশেরও প্রতীক হয়ে ওঠে। আমাদের বঙ্গদেশে দীপাবলীতে চৈতন্যময়ী অসুরনাশিনী কালীর আরাধনায় অশুভ শক্তির বিনাশের সেই ভাবনাটুকুও রয়ে গেছে সেই কোন কাল থেকে।

লেখিকা পুরাণ গবেষক।


Share